Home Second Lead ঠকবাজির হাট: সিমেন্টে ফ্লাই অ্যাশের মহোৎসব

ঠকবাজির হাট: সিমেন্টে ফ্লাই অ্যাশের মহোৎসব

শামসুল ইসলাম, ঢাকা:
দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো সিমেন্ট। মানুষের সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে গড়া স্বপ্নের বাড়িটি কতটুকু নিরাপদ, তা নির্ভর করে এই সিমেন্টের গুণগত মানের ওপর। তবে বর্তমানে সিমেন্ট শিল্পে এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। অধিক মুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু উৎপাদনকারী ও সিন্ডিকেট সিমেন্টে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ‘ফ্লাই অ্যাশ’ (কয়লা পোড়া ছাই) ও সূক্ষ্ম বালু মিশিয়ে বাজারজাত করছে। সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে চলে এই ‘ঠকবাজির হাট’।
ফ্লাই অ্যাশ কী এবং কেন এই কারচুপি?
ফ্লাই অ্যাশ মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি উপজাত বা বর্জ্য। সিমেন্ট তৈরিতে এটি ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক অনুমোদন থাকলেও তার একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাজারে মূলত দুই ধরনের সিমেন্ট পাওয়া যায়— ওপিসি (OPC) এবং পিসিসি (PCC)।
পিসিসি সিমেন্টে নির্দিষ্ট অনুপাতে ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা সস্তা দরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত নিম্নমানের ছাই এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ বালু মিশিয়ে সিমেন্টের ওজন বৃদ্ধি করছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসলেও সিমেন্টের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নির্মাণ প্রকৌশলীর সতর্কবার্তা:
এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ নির্মাণ প্রকৌশলী তার কারিগরি ব্যাখ্যায় বলেন, সিমেন্টের কাজ হলো ঢালাইয়ের অন্যান্য উপাদান যেমন পাথর ও বালুকে শক্তভাবে ধরে রাখা। যখন সিমেন্টে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ছাই বা বালু থাকে, তখন সিমেন্টের ‘কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন’ বা রাসায়নিক বিক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না।
তিনি আরও যোগ করেন, অতিরিক্ত ফ্লাই অ্যাশযুক্ত সিমেন্ট দিয়ে তৈরি স্থাপনার স্থায়িত্ব সাধারণ সিমেন্টের তুলনায় অর্ধেকও হয় না। ঢালাই দেওয়ার কয়েক বছর পরেই কলাম, বিম এবং ছাদে সূক্ষ্ম ফাটল (Hairline Cracks) দেখা দিতে শুরু করে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এই ধরনের সিমেন্ট রডের ওপর প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
ফলে বাতাসের আর্দ্রতা ভেতরে প্রবেশ করে রডে দ্রুত মরিচা ধরিয়ে দেয়। এটি এমন এক নীরব ঘাতক যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভবনটিকে ভেতর থেকে নড়বড়ে করে দেয়। প্রকৌশলীর মতে, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এই ধরনের নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার করা মানে হলো মৃত্যুকূপ তৈরি করা।
ক্রেতাদের করণীয়:
বাজারের চকচকে বিজ্ঞাপন দেখে সিমেন্ট কেনা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা পরামর্শ দেন, বড় কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে ব্যবহৃত সিমেন্টের স্ট্রেন্থ বা শক্তি পরীক্ষার জন্য বুয়েট বা স্বীকৃত ল্যাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। এছাড়া বস্তার গায়ে উপকরণের তালিকা বা ‘স্পেসিফিকেশন’ ভালো করে যাচাই করা জরুরি।
আমাদের চারপাশের এই জালিয়াতি রুখতে কেবল প্রশাসনিক তদারকি যথেষ্ট নয়, ক্রেতাদের সচেতনতাও অপরিহার্য। প্রতারক চক্রের হাত থেকে বাঁচতে এবং আপনার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুণমান যাচাইয়ের কোনো বিকল্প নেই।