Home চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সাংবাদিকতায় সংকট: আশার আলো দেখাচ্ছে ‘হাইপার-লোকাল’ ডিজিটাল পোর্টাল

আঞ্চলিক সাংবাদিকতায় সংকট: আশার আলো দেখাচ্ছে ‘হাইপার-লোকাল’ ডিজিটাল পোর্টাল

ফরিদুল আলম, ঢাকা: বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের বিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো। বিজ্ঞাপনের বাজারের সংকুচিত হওয়া এবং ডিজিটাল বিপ্লবের ধাক্কায় বহু ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এই শূন্যস্থান পূরণে দাপটের সঙ্গে উঠে আসছে ‘হাইপার-লোকাল’ বা অতি-আঞ্চলিক ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল। বড় শহরের চাকচিক্যময় খবরের চেয়ে এখন নিজ পাড়া বা মহল্লার ছোট ছোট সমস্যা ও সম্ভাবনার খবরই সাধারণ মানুষকে বেশি টানছে।
বিশ্বজুড়ে স্থানীয় সংবাদপত্রের নীরব মৃত্যু
গত এক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে শত শত স্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ার ফলে তৈরি হচ্ছে ‘নিউজ ডেজার্ট’ বা সংবাদশূন্য এলাকা। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে ভুয়া তথ্য। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সংবাদপত্রের মুদ্রণ খরচ গত তিন বছরে প্রায় ৪০% বেড়েছে, যার ফলে অনেক প্রকাশনা এখন কেবল ডিজিটালের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে।
হাইপার-লোকাল: নতুন যুগের দিশারি
আঞ্চলিক সাংবাদিকতার এই সংকটে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। বড় গণমাধ্যমগুলো যেখানে কেবল জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ব্যস্ত, সেখানে হাইপার-লোকাল পোর্টালগুলো নজর দিচ্ছে সাধারণ মানুষের অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে। যেমন—রাস্তার বেহাল দশা, স্থানীয় বাজারের পণ্যের দাম, এলাকার সফল উদ্যোক্তা কিংবা ড্রেনেজ সমস্যার মতো মৌলিক বিষয়গুলো।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত: চট্টগ্রামের প্রবীণ সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিবর্তন অবধারিত ছিল। তাদের মতে, “মানুষ এখন সব খবরের ভিড়ে নিজের চারপাশের খবরটি সবার আগে জানতে চায়। বড় সংবাদপত্রগুলোর পক্ষে প্রতিটি পাড়ায় পৌঁছানো সম্ভব নয়, যা ডিজিটাল পোর্টালগুলো অনায়াসেই করছে।”
একজন স্থানীয় সংবাদ পোর্টাল সম্পাদকের মতে: “আমরা শুধু তথ্য দিই না, আমরা সমস্যার সমাধানে প্রভাব ফেলি। যখন আমাদের পোর্টালে এলাকার একটি ভাঙা রাস্তা নিয়ে খবর প্রকাশ হয় এবং পরদিনই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়, তখন পাঠকদের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই আস্থাই হাইপার-লোকাল পোর্টালের মূল শক্তি।”
চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ
তবে এই নতুন ধারার সাংবাদিকতার সামনেও রয়েছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, টেকসই আয়ের মডেল তৈরি করা; দ্বিতীয়ত, সংবাদে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতেও এসব পোর্টাল ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাইপার-লোকাল পোর্টালগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে ‘কমিউনিটি ফান্ডিং’ বা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
সংকট থাকলেও স্থানীয় সাংবাদিকতা এখন নতুন রূপ নিচ্ছে। কাগজের পাতা থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে স্থানান্তরিত হওয়া এই সাংবাদিকতাই হতে পারে আগামীর গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড।