ইন্দোনেশিয়ার একমাত্র আচেহ প্রদেশে শরিয়াহ আইনের কঠোর প্রয়োগের সর্বশেষ নজির হিসেবে একটি নতুন ঘটনা সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক লাইভে অনৈতিক আচরণের দায়ে এক তরুণ ও তরুণীকে প্রকাশ্য দোররা দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ঘটনার পটভূমি ও অপরাধ
আচেহ প্রদেশের রাজধানী বান্দা আচেহ-র বাসিন্দা ওই তরুণ ও তরুণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকে একটি লাইভ স্ট্রিমিং করছিলেন। লাইভ চলাকালীন তারা পরস্পরকে চুমু খান এবং আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করেন, যা দ্রুত স্থানীয় নেটিজেনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে। যেহেতু তারা বিবাহিত ছিলেন না, তাই আচেহ-র ‘উইলাতুল হিসবাহ’ (ইসলামী নৈতিকতা পুলিশ) বিষয়টি আমলে নেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে শরিয়াহ পুলিশ পরবর্তীতে তাদের আটক করে আদালতে সোপর্দ করে।
আদালতের রায় ও কানুন
আচেহ প্রদেশের নিজস্ব ইসলামী দণ্ডবিধি বা ‘কানুন’-এর আওতায় অবিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে যেকোনো ধরনের শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, চুম্বন বা নির্জনবাস (যা ‘খালওয়াত’ বা ‘ইখতিলাত’ নামে পরিচিত) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শরিয়াহ আদালতের বিচারক শুনানিতে ডিজিটাল প্রমাণ ও আসামিদের স্বীকারোক্তি বিবেচনা করে তাদের ‘ইখতিলাত’ (অবিবাহিত অবস্থায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা) অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত প্রথমে তাদের প্রত্যেককে ২৩টি করে দোররা মারার নির্দেশ দিলেও, হাজতবাসের দিনগুলো হিসাব করে চূড়ান্তভাবে ২১টি করে দোররা (বেত্রাঘাত) কার্যকর করার আদেশ দেন।
প্রকাশ্য শাস্তি কার্যকর
আচেহ-র ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুযায়ী, এই শাস্তি কোনো বদ্ধ ঘরে না দিয়ে জনসাধারণের সামনে কার্যকর করা হয়। বান্দা আচেহ-র একটি মসজিদের সামনের চত্বরে এই শাস্তির আয়োজন করা হয়, যেখানে শত শত স্থানীয় বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন। শাস্তি কার্যকরের সময় ‘আলগোজো’ (মুখোশধারী ঐতিহ্যবাহী বেত্রাঘাতকারী) বেত দিয়ে একে একে তরুণ ও তরুণীর পিঠে ২১টি আঘাত করেন। এ সময় সেখানে নিয়োজিত চিকিৎসকের একটি দল তাদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও বিশ্ব প্রতিক্রিয়া
আচেহ প্রদেশের শরিয়াহ পুলিশ প্রধান সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তরুণ প্রজন্ম যাতে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অবক্ষয়ের দিকে না যায়, সেজন্যই এই শাস্তির মাধ্যমে একটি কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে আচেহ প্রদেশের এই প্রকাশ্য দোররা প্রথার সমালোচনা করে আসলেও, ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের চুক্তি অনুযায়ী আচেহ প্রদেশ নিজস্ব ধর্মীয় আইন বজায় রাখার পূর্ণ আইনি অধিকার ভোগ করে। স্থানীয় জনগণের একটি বড় অংশও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে এই আইনের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে আসছে।