Home Second Lead নির্ধারিত দাম কাগজে, গ্যাস আছে ‘টেবিলের নিচে’

নির্ধারিত দাম কাগজে, গ্যাস আছে ‘টেবিলের নিচে’

রাজধানী থেকে বন্দরনগরী—একই চিত্র, একই হাহাকার। এলপি গ্যাসের বাজার এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এক ‘ব্ল্যাক হোল’। সরকার প্রতি মাসে ঘটা করে দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে তার ছিটেফোঁটাও মিলছে না। বিক্রেতাদের মুখে সেই চেনা অজুহাত—’সাপ্লাই নেই’। কিন্তু পকেটের ওপর বাড়তি টাকার চাপ দিলে মুহূর্তেই সেই সংকট উবে যায়, ঝকঝকে সিলিন্ডার হাজির হয় দুয়ারে।
কৃত্রিম এই সংকটের পেছনের কারিগর কারা? প্রশাসন যখন অভিযানে ব্যস্ত, সিন্ডিকেট তখন ব্যস্ত পকেট কাটায়।
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাজারের চিত্রটা এখন অনেকটা রহস্য উপন্যাসের মতো। সাধারণ ক্রেতা দোকানে গিয়ে যখন সরকারি নির্ধারিত দামে গ্যাস খুঁজছেন, তখন উত্তর মিলছে—”গ্যাস নেই, সাপ্লাই বন্ধ।” কিন্তু পর্দার পেছনের চিত্রটা ভিন্ন। নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে রাজি হলেই দোকানের পেছনের ঘর বা গোপন মজুদ থেকে বেরিয়ে আসছে এলপিজি সিলিন্ডার। অর্থাৎ, গ্যাস নেই সাধারণের জন্য, কিন্তু গ্যাস আছে অতিরিক্ত মুনাফাখোরদের জন্য।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের চরম দুর্ভোগের কথা:

মিরপুর ১০ নম্বরের গৃহিণী শায়লা বেগম: “সকাল থেকে তিনটা দোকান ঘুরেছি, সবাই বলছে গ্যাস নেই। অথচ পরিচিত একজনের মাধ্যমে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে পাশের গলি থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করতে হয়েছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পকেট কাটার জন্যই কি এই কৃত্রিম সংকট?”

যাত্রাবাড়ীর রিকশাচালক মো. করিম: “সরকার দাম ঠিক করে দিছে, কিন্তু দোকানে গেলে বলে কোম্পানি থেকে বেশি দামে কেনা। বাড়তি টাকা না দিলে চুলা জ্বলে না। দিনশেষে আমাদেরই না খেয়ে থাকার দশা।”

মোহাম্মদপুরের বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান: “মোবাইল কোর্ট এসে জরিমানা করে যায়, দোকান দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে, তারপর আবার আগের চিত্র। সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে প্রশাসনের ভয় তাদের নেই।”

সংকট নিরসনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসন নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে, এমনকি অনেককে জেলেও পাঠানো হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

বিক্রেতারা বলছেন, “কোম্পানি থেকে আমাদের বেশি দামে কিনতে হয়, আমরা কম দামে বেচব কীভাবে?” অন্যদিকে ডিলাররা দোষ চাপাচ্ছেন আমদানিকারকদের ওপর। এই চক্রব্যূহে সাধারণ ভোক্তা কেবল বলির পাঁঠা।

বর্তমান সংকট কাটাতে এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে:

আমদানি তদারকি: এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে বড় বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর এলসি (LC) খোলা এবং মজুদের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বিইআরসি-র কঠোর হুঁশিয়ারি: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করলে ডিলারশিপ ও লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

তদারকি সেল গঠন: বাজারে তদারকি জোরদার করতে জেলা পর্যায়ে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিদিন বড় বাজারগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছে।

সরাসরি সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা: সরকারি কোম্পানি ওমেরা বা এলপি গ্যাস লিমিটেডের মাধ্যমে ডিলার পর্যায়ে সরাসরি সরবরাহ বাড়িয়ে বেসরকারি সিন্ডিকেট ভাঙার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

“গ্যাস নেই, গ্যাস আছে”—এই দ্বিমুখী সংকট থেকে মুক্তি পেতে কেবল জরিমানা যথেষ্ট নয়। সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত কার লাভ কত, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের হাহাকার থামানো সম্ভব হবে না।