Home First Lead দূষণ ও জনবিক্ষোভে বন্ধ হচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎ

দূষণ ও জনবিক্ষোভে বন্ধ হচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎ

ছবি এ আই
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার তাগিদে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ বা হ্রাসের ধারা ত্বরান্বিত হয়েছে।

কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হলেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এই কেন্দ্রগুলো থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড , সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড  এবং সূক্ষ্ম কণিকা বায়ু দূষণ তৈরি করে। এছাড়া, ভারী ধাতু যেমন সীসা, পারদ ও আর্সেনিক জল ও মাটি দূষণেও ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি কয়লা কেন্দ্রের কারণে বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন টন নিঃসৃত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ।

দূষণের কারণে অনেক দেশে জনবিক্ষোভ এবং স্থানীয় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জলবায়ু আন্দোলনকারীরা সরাসরি সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করছে যাতে এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা হয়।

বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশসমূহ

🇬🇧 যুক্তরাজ্য: ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা হয়। এটি দেশটির জলবায়ু প্রতিশ্রুতির অংশ।

🇩🇰 ডেনমার্ক: ২০০০ সালে বন্ধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা ২০২০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়।

🇹🇷 তুরস্ক: চাতালাজি কয়লা কেন্দ্র ২০২০ সালে বন্ধ করা হয়, কারণ এটি নতুন বায়ু দূষণ বিধিমালা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

বন্ধের পথে থাকা দেশসমূহ

🇩🇪 জার্মানি: ২০৩৮ সালের মধ্যে সব কয়লা কেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনা। নাগরিক আন্দোলন দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে।

🇫🇷 ফ্রান্স: ২০২৭ সালের মধ্যে কয়লা কেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

চীন ও ভারত: কিছু পুরনো কেন্দ্র ধীরে ধীরে বন্ধের পথে রয়েছে।

যেসব দেশে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বিদ্যমান ছিল বা সম্প্রতি বন্ধ করা হয়েছে, সেসব এলাকায় দেখা গেছে:

বায়ুদূষণ ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ বৃদ্ধি: কয়লা পোড়ানোর সময় নির্গত সূক্ষ্ম কণিকা, সালফার ডাইঅক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড বাতাসে মিলিত হয়ে ঘন কুয়াশা ও দূষিত পরিবেশ সৃষ্টি করে। শিশু, প্রবীণ ও শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগ ও ফুসফুস সংক্রান্ত জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

জল ও মাটি দূষণ: সীসা, পারদ ও অন্যান্য ভারী ধাতু নদী, জলাশয় ও মাটিতে জমা হয়। এতে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও পানীয় জল বিপন্ন হয়।

গ্লোবাল ও লোকাল উষ্ণায়ন: কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, শুকনো মৌসুম, তীব্র গরম ও অকাল বৃষ্টি সৃষ্টি করে।

জনস্বাস্থ্যের খরচ বৃদ্ধি: দূষণের কারণে চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি, হাসপাতাল ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মদিবসের ক্ষতি দেখা দেয়।

বিশ্বের উদাহরণ দেখিয়েছে, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার জন্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ বা হ্রাস করা জরুরি। যারা ইতিমধ্যেই বন্ধ করেছে, তারা ইতিবাচক ফলাফল দেখেছে—শ্বাসযন্ত্রের রোগ কমেছে, বায়ুদূষণ হ্রাস পেয়েছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য কিছুটা পুনরুদ্ধার পাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিবেশগত ঝুঁকি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎসে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ বা হ্রাসের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে জনবিক্ষোভ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায়। বাংলাদেশের জন্যও সময় এসেছে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নজর দেওয়ার, যাতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষা করা যায় এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগোনো সম্ভব হয়।