Home First Lead মহাপরিকল্পনায় সিআরবি: ১০০ কোটির প্রকল্প কি কেবলই কাগজে?

মহাপরিকল্পনায় সিআরবি: ১০০ কোটির প্রকল্প কি কেবলই কাগজে?

সিআরবি। ছবি সংগৃহীত

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকাকে ঘিরে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিকল্পনায় (Railway Master Plan) রয়েছে এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলী ও অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে এই দলিলে। তবে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিকল্পনা কি কেবল রেলওয়ের নথিতেই সীমাবদ্ধ? বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না আসায় নাগরিক মনে দেখা দিয়েছে সংশয়।

মাস্টারপ্ল্যান ও প্রকল্প ২৪-এর প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদ করা ৩০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই মহাপরিকল্পনার ২০৮ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘প্রকল্প নম্বর ২৪’ হিসেবে সিআরবি এলাকার সংস্কার ও সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয় সিআরবি-র প্রাচীন ভবনগুলোর সংস্কার এবং এর চারপাশের পাহাড় ও বনরাজিকে অক্ষুণ্ণ রেখে একটি আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব হেরিটেজ পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা।

কাগজে কলমে সময় শেষ, বাস্তবে শুরুই হয়নি

রেল মহাপ্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এই ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ ছিল মাস্টারপ্ল্যানের ১ম পর্যায়ে (২০১৬-২০২০ সাল)। ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেছে ছয় বছর আগে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিআরবি সংস্কারের পরিবর্তে বিগত বছরগুলোতে এই এলাকাটি দখল ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের নানামুখী তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে পিপিপি মডেলে হাসপাতাল নির্মাণের বিতর্কিত উদ্যোগের কারণে ঐতিহ্য রক্ষার মূল প্রকল্পটি আড়ালে চলে যায়।

নাগরিক সমাজের উদ্বেগ

চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীদের মতে, সিআরবি কেবল রেলওয়ের প্রশাসনিক দপ্তর নয়, এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস ও অক্সিজেনের প্রধান উৎস। মাস্টারপ্ল্যানে ১০০ কোটি টাকার যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, তা যদি যথাসময়ে ব্যয় করা হতো, তবে আজ সিআরবি-কে ঘিরে হাসপাতাল বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক আগ্রাসনের সুযোগ সৃষ্টি হতো না। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে স্থানীয়দের দাবি, মাস্টারপ্ল্যানের সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত তহবিল বরাদ্দ করে সিআরবি-কে পূর্ণাঙ্গ হেরিটেজ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হোক।

কেন এই স্থবিরতা?

 বিশ্লেষণে দেখা যায়, রেলওয়ের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়লেও ঐতিহ্য রক্ষার এই প্রকল্পে স্থবিরতার প্রধান কারণ হলো ‘বাণিজ্যিক স্বার্থ’। মাস্টারপ্ল্যানে সরকারি অর্থায়নে (GoB) এই প্রকল্পের কথা বলা থাকলেও রেলওয়ের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়েছে সেখানে লাভজনক বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা করতে। এর ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে; সাধারণ মানুষের প্রাণের স্পন্দন সিআরবি না পেয়েছে সংস্কারের ছোঁয়া, না রক্ষা পেয়েছে অযাচিত বিতর্ক থেকে।

এখন সময় এসেছে এই ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইলটি পুনরায় খোলার। ২০৪৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত রেলওয়ের মহাপরিকল্পনা যদি সফল করতে হয়, তবে ঐতিহ্যের এই স্তম্ভটিকে অবহেলার সুযোগ নেই। মাস্টারপ্ল্যান যেন কেবল ড্রয়ারে জমা থাকা একগুচ্ছ কাগজ না হয়ে চট্টগ্রামের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়—এমনটাই এখন বড় প্রত্যাশা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে , ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই ধারক ভবনটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কারের একটি বড় কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সংস্কারের মূল শর্তই হলো এর মূল স্থাপত্যশৈলী বা কাঠামোর কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবনটি তার আদি রূপ ফিরে পাবে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ রেল ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকবে।

ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com