হেলথ ডেস্ক: স্থূলতা, যা একসময় কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ তা এক জটিল, দীর্ঘমেয়াদি রোগের রূপ নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, বন্ধ্যাত্ব, এমনকি ডিপ্রেশনের মতো অসংখ্য রোগের প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা শরীরের ওজন। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গত দুই-তিন দশকে ডায়েট ও ব্যায়ামের পাশাপাশি ওষুধ হয়ে উঠেছে এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে, এই ওষুধগুলোর ইতিহাস, কার্যপদ্ধতি, সুবিধা-অসুবিধা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা ভুল ধারণা। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং ওজন কমানোর পুরোনো ও আধুনিক ওষুধ, নতুন থেরাপি এবং কারা এই ওষুধ নেবেন, তা নিয়ে আলোকপাত করেছেন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ও স্থূলতা বিশেষজ্ঞ ডা. অরূন্ধতী দাশগুপ্ত।
প্রাক্তন ও পুরোনো ওজন নিয়ন্ত্রক ওষুধ: এক ঝলকে
অরলিস্ট্যান্ট: দীর্ঘকাল ধরে এটি ছিল সবচেয়ে প্রচলিত ওষুধ। এর কাজ করার পদ্ধতি হলো, এটি খাবারের চর্বি শোষণ হতে দেয় না, ফলে শোষিত না হওয়া চর্বি মলের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এর সুবিধা হলো, প্রায় ৫-৮ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমাতে সক্ষম। তবে এর প্রধান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈলাক্ত মল, পাতলা পায়খানা, গ্যাস নির্গমনের সঙ্গে তেল বের হওয়া এবং ভিটামিন-এ, ডি, ই, কে’র ঘাটতি। এই অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক রোগীই এটি দীর্ঘ দিন চালিয়ে যেতে পারেন না।
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রক সেন্ট্রাল অ্যাপেটাইট সাপ্রেস্যান্টস: এই শ্রেণীর মধ্যে ছিল সিবুট্রামিন, যা এর গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক দেশে নিষিদ্ধ। ভারতেও এটি কয়েক বছর আগে বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর কারণ ছিল হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি।
ফেনটারমিন ও টোপিরামেট কম্বিনেশন: এই জাতীয় ওষুধ খিদে কমায় এবং এক ধরনের উচ্ছ্বাসজনিত অনুভূতি দিতে পারে। তবে ভারতে এর নিয়মিত ব্যবহারে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আধুনিক যুগের ওজন কমানোর ওষুধ: বিপ্লব এনেছে ইনক্রেটিন-ভিত্তিক থেরাপি
গত ১০-১২ বছরে ইনক্রেটিন-ভিত্তিক ইনজেকশনগুলো ওজন কমানোর চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব এনেছে।
GLP-1 রেসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট: এটি আমাদের অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া GLP-1 হরমোনের মতো আচরণ করে। এই হরমোনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ১. খিদে কমানো, ২. খাবার পর দ্রুত পরিতৃপ্তি তৈরি করা এবং ৩. পাকস্থলীর খালি হওয়া ধীর করা। ফলস্বরূপ, রোগীরা স্বাভাবিকভাবেই কম খাবার খান, অনিয়ন্ত্রিত খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং সামগ্রিক ক্যালোরি গ্রহণ হ্রাস পায়। এই হরমোন ইনসুলিন নিঃসরণও নিয়ন্ত্রণ করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী।
১. লিরাগ্লুটাইড (৩ এমজি): এটি মস্তিষ্কের ক্ষুধা কেন্দ্রকে কম সংবেদনশীল করে তোলে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভব হয় এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ উন্নত করে। এটি প্রায় ৮-১২ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমায়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে বমিভাব, পেটব্যথা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রয়েছে। এটি প্রতিদিন নিতে হয়, তাই অনেকেই পরবর্তীতে সাপ্তাহিক ইনজেকশনের দিকে ঝুঁকেছেন।
২. সেমাগ্লুটাইড (২.৪ এমজি, সপ্তাহে একবার): সেমাগ্লুটাইড-এর আগমন স্থূলতা থেরাপিকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে, কারণ এটি ক্ষুধাভিত্তিক পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এটি ১৫-১৮ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমায়। ডায়াবেটিস রোগীদের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফ্যাটি লিভার ও পিসিওএসে উন্নতি ঘটায়। এমনকি হৃদরোগে মৃত্যুহার কমাতেও এটি সক্ষম।
৩. টিরজেপাটাইড (GLP-1 + GIP অ্যাগোনিস্ট): নতুন, বহুগুণী ও পরবর্তী প্রজন্মের ওষুধ (Dual+Triple agonists): টিরজেপাটাইড একটি ডুয়েল ইনক্রেটিন মিমেটিক। এটি শরীরের GLP-1 এবং GIP নামে দুটি প্রাকৃতিক হরমোনের কার্যক্রমকে সক্রিয় করে। GLP-1 খিদে দমন, তৃপ্তি ও ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অন্যদিকে, GIP শরীরের চর্বি ভাঙা, শক্তিব্যয় বাড়ানো ও মেটাবলিজম উন্নত করতে ভূমিকা রাখে। এই দুটি হরমোন একসঙ্গে কাজ করার ফলে শরীরকে এক বহুস্তরীয় মেটাবলিক অ্যাডভান্টেজ দেয়, যা ওজন কমানোকে আরও ধারাবাহিক ও গভীর করে তোলে। এটি ২০-২২ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমায়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির কাছাকাছি ফলাফল দেখা গিয়েছে।
কেন এই অণুগুলো এত সফল?
এই নতুন ওষুধগুলো শুধু খিদে দমন করে না বা কেবল ক্যালোরি কাটিংয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং শরীরের হরমোনের জটিলতাকে ঠিক করে, মেটাবলিক রিসেট ঘটায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতা সম্পর্কিত রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার, স্লিপ অ্যাপনিয়া কমাতে সাহায্য করে। বিজ্ঞাননির্ভর স্থূলতা চিকিৎসায় এই ধরনের হরমোনভিত্তিক থেরাপি যে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে, সে ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-ও স্বীকৃতি দিয়েছে। GLP-1 ও ডুয়েল-অ্যাগোনিস্ট-গুলি সাধারণত নিরাপদ। তবে বমিভাব, পেটের সমস্যা, খাওয়ার পর দ্রুত পেট ভরা লাগা, এবং খুব কম সংখ্যক ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াটিস হতে পারে। সঠিক ডোজ টাইট্রেশনের মাধ্যমে সাধারণত এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো কমে আসে।
ভবিষ্যতের থেরাপি: আরও কার্যকর সমাধানের পথে
রেটাট্রুটাইড (ট্রিপল অ্যাগোনিস্ট – GLP-1 + GIP + Glucagon): ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি ২৪-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমাতে পারে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। অনেকে একে “নন-সার্জিকাল ব্যারিয়াট্রিক মেডিসিন” বলছেন।
ক্যাগ্রিলিনটাইড + সেমাগ্লুটাইড কম্বিনেশন (অ্যামিলিন + GLP-1): এটি খিদে আরও বেশি কমায় এবং দীর্ঘস্থায়ী তৃপ্তি দেয়।
কারা ওজন কমানোর ওষুধ নেবেন?
ওজন কমানোর ওষুধ কোনো ফ্যাশন নয়, তাই এটি সবার জন্য নয়। এটি নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়: যাদের বিএমআই (BMI) ≥ ৩০ হলে, অথবা যাদের বিএমআই ≥ ২৭ হলে এবং এর সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্লিপ অ্যাপনিয়া, ব্যথাজনিত হাঁটু সমস্যা, ফ্যাটি লিভার, পিসিওএস (PCOS) রয়েছে এবং যারা আগে বহুবার ডায়েট-ব্যায়াম করে ব্যর্থ হয়েছেন।
ওষুধ কতদিন খেতে হবে?
স্থূলতা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ঠিক ডায়াবেটিস বা রক্তচাপের মতোই। তাই অনেকের ক্ষেত্রে চিকিৎসাও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। ওষুধ বন্ধ করলে কিছু মানুষের আবার ওজন বাড়তে পারে, যা স্বাভাবিক, কারণ শরীর তার ‘সেট-পয়েন্ট’-এ ফিরে যেতে চায়। বিজ্ঞান বলছে: ওষুধ + সঠিক ডায়েট + ব্যায়াম = সর্বোচ্চ ফলাফল। ওষুধ খিদে কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু খাবার নির্বাচন, অংশ নিয়ন্ত্রণ, প্রোটিন বাড়ানো, চিনি ও ট্রান্সফ্যাট কমানো, হাঁটা-ব্যায়াম – এগুলো ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি।
ওজন কমানোর ওষুধ কয়েক দশক ধরে প্রচলিত থাকলেও, নতুন প্রজন্মের ইনজেকশনগুলো স্থূলতা চিকিৎসাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। এগুলো শুধু ওজন কমায় না, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, পিসিওএস, হৃদরোগ – সবক্ষেত্রেই উন্নতি আনতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো ম্যাজিক নয়, বরং সঠিক রোগী, সঠিক ওষুধ, সঠিক ডোজ, সঠিক তত্ত্বাবধান – এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা।
এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










