Home Second Lead মাছের পেটে প্লাস্টিক, শেষ গন্তব্য মানুষের পাতে: স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ

মাছের পেটে প্লাস্টিক, শেষ গন্তব্য মানুষের পাতে: স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ

 স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ

শামসুল ইসলাম, ঢাকা: বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সাগরের মাছ এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো খাবার মনে করে গ্রহণ করছে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যচক্রে ঢুকে পড়ছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এক গবেষণা প্রতিবেদনে গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম এক ‘অশনি সংকেত’।
গভীর সমুদ্র থেকে মানুষের ডাইনিং টেবিল: যেভাবে ছড়াচ্ছে বিষ
গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen-এর জরিপে দেখা গেছে, সমুদ্রের ২,০০০ মিটার গভীরতায়ও প্লাস্টিক বর্জ্য পৌঁছে গেছে। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এগুলো খাওয়ার ফলে তাদের রক্ত ও মাংসে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মিশে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা যখন সামুদ্রিক মাছ বা চিংড়ি খাই, তখন এই বিষাক্ত কণাগুলো সরাসরি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। একে বলা হচ্ছে ‘বায়ো-অ্যাকুমুলেশন’, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করতে পারে।
কী কী স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে?
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মাছের মাধ্যমে শরীরে ঢোকা মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—-
ক্যান্সারের ঝুঁকি: প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ক্যান্সারের জন্ম দিতে পারে।
কিডনি ও লিভারের ক্ষতি: রক্তপ্রবাহে মেশা এসব কণা শরীরের ছাঁকনি হিসেবে পরিচিত অঙ্গগুলোকে বিকল করে দেয়।
প্রজনন সমস্যা: দীর্ঘমেয়াদে প্লাস্টিক দূষণ মানুষের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া: গর্ভবতী নারী বা শিশুরা এমন মাছ খেলে মস্তিষ্কের বিকাশ ও শারীরিক বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়।

গবেষণায় উঠে আসা ভয়াবহ কিছু তথ্য

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বৈঠকে জানিয়েছেন, সাগরে বর্তমানে অতিরিক্ত জেলি ফিশের আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যা বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্যহীনতার প্রমাণ। এছাড়া বড় মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং ‘সোনার ফিশিং’-এর মতো আগ্রাসী পদ্ধতিতে মাছ ধরায় সমুদ্রের পুরো খাদ্য শৃঙ্খল বিষাক্ত হয়ে পড়ছে।
প্রধান উপদেষ্টার উদ্বেগ ও কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ
মঙ্গলবার যমুনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এই প্লাস্টিক দূষণকে জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, “আমাদের বিশাল জলসীমার সম্পদ আমরা কাজে লাগাতে চাই, কিন্তু তা বিষাক্ত অবস্থায় নয়। প্লাস্টিক দূষণ রোধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে: ১. বঙ্গোপসাগরের নিচে আবিষ্কৃত ‘ফিশিং নার্সারি’ এলাকাগুলোকে সংরক্ষিত ও প্লাস্টিকমুক্ত ঘোষণা করা হবে। ২. ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির বিশেষ জাহাজ ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ দিয়ে সমুদ্রের তলদেশের দূষণ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। ৩. প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে ফেলা বন্ধে উপকূলীয় অঞ্চলে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
সমুদ্র রক্ষা মানেই জনস্বাস্থ্য রক্ষা। যদি এখনই প্লাস্টিকের ব্যবহার ও সাগরে বর্জ্য ফেলা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে বঙ্গোপসাগরের মাছ আমাদের জন্য পুষ্টির বদলে বিষ বয়ে আনবে। দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবন বাঁচাতে এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই এখন সময়ের দাবি।