শামসুল ইসলাম, ঢাকা: বঙ্গোপসাগরের গভীর জলরাশিতে শুরু হয়েছে এক অসম যুদ্ধ। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অন্যদিকে ‘সোনার’ (Sonar) প্রযুক্তির মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে মাছ ধরার আগ্রাসী পদ্ধতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সাগরের বাস্তুসংস্থান এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কী এই ‘সোনার ফিশিং’ এবং কেন এটি বিপজ্জনক?
‘সোনার’ (Sound Navigation and Ranging) হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে পানির নিচে মাছের সঠিক অবস্থান, ঝাঁকের আকার এবং গভীরতা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে।
ছেঁকে তোলা হচ্ছে মাছ: এই প্রযুক্তির সাহায্যে ট্রলারগুলো সাগরের নির্দিষ্ট এলাকার পুরো মাছের ঝাঁককে শনাক্ত করে নির্বিচারে আহরণ করছে। এতে ছোট-বড় বা প্রজননক্ষম মাছের কোনো বাছবিচার থাকছে না।
ক্ষুদ্র জেলেদের জীবিকায় টান: বর্তমানে গভীর সমুদ্রে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ট্রলারের মধ্যে প্রায় ৭০টি ট্রলার এই ‘সোনার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর ফলে গভীর সমুদ্রের সব মাছ বড় ট্রলারের কবজায় চলে যাচ্ছে, আর উপকূলীয় বা অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ক্ষুদ্র জেলেরা ফিরছেন খালি হাতে।
- গবেষণার ভয়াবহ তথ্য
- সম্প্রতি গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ বা ‘ওভারফিশিং’-এর কারণে সাগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এর ফলে: ১. ২০১৮ সালের তুলনায় বড় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ২. মাছেদের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র ব্যাহত হচ্ছে। ৩. বড় মাছ কমে যাওয়ায় সাগরে জেলি ফিশের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে, যা সমুদ্রের অসুস্থতার লক্ষণ।
- সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি
- মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক বৈঠকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এই প্রযুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “সোনার ফিশিং একটি অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সামুদ্রিক সম্পদ শেষ হয়ে যাবে। সরকার দ্রুতই এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সিদ্ধান্ত নেবে।”
- প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ: সম্পদের সুরক্ষা আগে
- বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমার সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে আগে তা রক্ষা করতে হবে। তিনি যত্রতত্র মাছ ধরা বন্ধ করে পরিকল্পিত ও টেকসই মৎস্য আহরণ নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেন। বিশেষ করে সুন্দরবনের নিচে আবিষ্কৃত ‘ফিশিং নার্সারি’ রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি জানান।
- বিশেষজ্ঞের অভিমত
- সামুদ্রিক বিজ্ঞানী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরীর মতে, “প্রযুক্তি আমাদের সক্ষমতা বাড়ালেও প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে এর ব্যবহার হিতে বিপরীত হচ্ছে। সোনার ফিশিং বন্ধ না করলে সাগরের বড় মাছের বংশবৃদ্ধি চিরতরে থমকে যেতে পারে।”
- বঙ্গোপসাগর রক্ষা করা মানে কেবল মাছ রক্ষা করা নয়, বরং বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতি রক্ষা করা। তাই ‘সোনার’ প্রযুক্তির এই আগ্রাসন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।










