বিলুপ্তির পথে অনন্য জেনেটিক সম্পদ আরসিসি
মাহবুব হাসান, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড় আর উপকূলীয় জনপদের গর্ব, দেশের অন্যতম সেরা গবাদিপশুর জাত ‘রেড চিটাগাং ক্যাটল’ (RCC) বা স্থানীয় ভাষায় ‘লাল বিরিশ’ আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। অপরিকল্পিত সংকরায়ণ, সঠিক প্রজনন নীতির অভাব এবং চারণভূমির সংকটে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে এই বিশেষ জাতের গরুর সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অচিরেই বাংলাদেশের এই অমূল্য জেনেটিক সম্পদ পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।
অনন্য বৈশিষ্ট্য ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
রেড চিটাগাং ক্যাটল শুধু তার আকর্ষণীয় গাঢ় লাল বর্ণের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর রয়েছে অসাধারণ কিছু প্রাকৃতিক গুণাগুণ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (BAU) পশুপালন অনুষদের প্রফেসর ড. এ.কে. ফজলুল হক ভূঁইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত ‘Red Chittagong Cattle Genome Project’-সহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য জাতের তুলনায় এদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (যেমন: টিক-বোর্ন ডিজিজ) এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা জিনগতভাবেই অনেক বেশি।
আরসিসি-র প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
পুষ্টিগুণ: এর দুধের ফ্যাটের পরিমাণ প্রায় ৪.৮% থেকে ৬%, যা অন্য জাতের চেয়ে অনেক বেশি।
খরচ সাশ্রয়ী: তুলনামূলক কম খাবার খেয়েও এরা পর্যাপ্ত দুধ ও মাংস উৎপাদনে সক্ষম।
মাংসের স্বাদ: এই গরুর মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু হওয়ায় কোরবানির বাজারে এর চাহিদা থাকে আকাশচুম্বী।
সংকটের মূলে অবাধ সংকরায়ণ ও নীতমালার অভাব
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই জাতটি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে অবাধ সংকরায়ণ। অধিক দুধের আশায় খামারিরা ফ্রিজিয়ান বা অন্যান্য বিদেশি জাতের সাথে আরসিসি-র প্রজনন ঘটাচ্ছে, ফলে বিশুদ্ধ জাতের বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নগরায়ণের ফলে চারণভূমির অভাব এবং মাঠ পর্যায়ে বিশুদ্ধ ষাঁড়ের বীজের (Semen) সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) ২০০৪ সাল থেকে এই জাত সংরক্ষণে কিছু প্রকল্প হাতে নিলেও বর্তমানে কোনো শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোতে এদের সম্ভাবনা নিয়ে একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয়
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এই ‘লাল মানিক’দের রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন: ১. উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘বিশুদ্ধ আরসিসি বুল স্টেশন’ স্থাপন। ২. জাতীয়ভাবে আরসিসি রেজিস্ট্রি বা ‘হার্ড বুক’ তৈরি করে বিশুদ্ধ বংশলতিকা সংরক্ষণ। ৩. খামারিদের সরাসরি বিশেষ প্রণোদনা ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
রেড চিটাগাং ক্যাটল কেবল একটি গবাদিপশু নয়, এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। দেশের প্রাণিজ আমিষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই অনন্য জেনেটিক সম্পদ টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী ‘লাল গরু’ বা আরসিসি রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ খামারি বা উদ্যোক্তারা আর কী ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আপনি মনে করেন? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।










