মরদেহের মিছিলে কেন যোগ হচ্ছে দুই চাকা?
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়নের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সড়কের রক্তপাত। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ১৫১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬৭ জন। এটি মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৩ শতাংশের বেশি। কেন এই বাহনটি এখন মৃত্যুর সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে আমাদের বিশেষ অনুসন্ধান।
মৃত্যুর পরিসংখ্যানে মোটরসাইকেল শীর্ষে
গত এক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সড়কে নিহত মোট ৪৪৭ জনের মধ্যে ৩৭.৩৬ শতাংশই মোটরসাইকেল আরোহী। অর্থাৎ, সড়কে প্রতি তিনজনের একজন প্রাণ হারাচ্ছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, এই সময়ে আহত হয়েছেন ১৩৭ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার এই হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ এবং ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করাই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
চালক ও ভুক্তভোগীর ভাষ্য: রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোটরসাইকেল চালক আরমান হোসেন (২৪) বলেন:”আমি রাইড শেয়ারিং করি। জ্যামের মধ্যে দ্রুত ট্রিপ শেষ করার জন্য ফুটপাত বা উল্টো পথে চলার ঝুঁকি নিতে হয়। গত সপ্তাহে একটা ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগে আমার পা ভেঙে গেছে। আসলে জ্যাম আর বাড়তি আয়ের চক্করে আমরা নিজেদের জীবনের কথা ভুলে যাই।”
দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো এক শিক্ষার্থীর বাবা সালাহউদ্দিন আহমেদ ক্ষোভের সাথে বলেন:”ছেলের আবদার মেটাতে শখের বাইক কিনে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝছি আমি ওর হাতে বাহন নয়, মরণাস্ত্র তুলে দিয়েছিলাম। রাস্তায় কিশোরদের বেপরোয়া গতি আর ওভারটেকিং দেখার কেউ নেই।”
পরিবহন বিশেষজ্ঞের মতামত
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, শুধু চালকের অসতর্কতাই নয়, কাঠামোগত ত্রুটিও এর জন্য দায়ী। একজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ জানান: “মোটরসাইকেল মূলত একটি অস্থিতিশীল বাহন। আমাদের মহাসড়কগুলো উচ্চগতির বাসের জন্য তৈরি, সেখানে ছোট মোটরসাইকেল চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া তরুণরা রাস্তায় নামছে। রাজনৈতিক প্রভাবে হেলমেট ছাড়া এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার সংস্কৃতিও বড় কারণ।”
প্রতিকারের উপায়: বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
১. নিবন্ধন ও লাইসেন্স কঠোর করা: লার্নার কার্ড দিয়ে রাস্তায় নামা বন্ধ করে কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান করা। ২. মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা: ছোট গতির বাহন ও মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন না হওয়া পর্যন্ত মহাসড়কে এদের চলাচল সীমিত করা। ৩. ডিজিটাল ট্রাফিকিং: সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ এবং তাৎক্ষণিক মামলার ব্যবস্থা করা। ৪. আধুনিক গণপরিবহন: মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে শহরগুলোতে উন্নত বাস সার্ভিস চালু করা। ৫. জনসচেতনতা: অভিভাবক ও চালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হেলমেটবিহীন চলাচলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি।
সড়ক কোনো মরণফাঁদ হওয়া উচিত নয়। সঠিক পরিকল্পনা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে আগামীর সুন্দর ও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে।
businesstoday24.com এর সাথেই থাকুন। এই প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান।