শিপিং ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জাহাজের জ্বালানি বা বাঙ্কার ফুয়েলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এই জ্বালানির দাম এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিশেষ করে এশীয় অঞ্চলে এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে নজিরবিহীন পরিস্থিতি
বিশ্বের প্রধান শিপিং হাব সিঙ্গাপুরে বর্তমানে বাঙ্কার ফুয়েলের দাম প্রতি টন ১,১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) চেয়েও প্রায় ৬০% বেশি। সাধারণত জাহাজের এই জ্বালানি অপরিশোধিত তেলের চেয়ে সস্তা হয়ে থাকে, কিন্তু ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের রিফাইনারিগুলোতে সরবরাহ সংকটের কারণে এই চিরচেনা চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে।
ভৌগোলিক বৈষম্য ও বাণিজ্যে স্থবিরতা
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সব অঞ্চলে সমান নয়। ফুজাইরাহ থেকে লং বিচ পর্যন্ত জ্বালানি টার্মিনালগুলোতে দাম প্রতি টন ১,১০০ ডলারের আশেপাশে থাকলেও রটারডাম, নিউ ইয়র্ক বা হিউস্টনের মতো দূরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে দাম প্রায় ৩২০ ডলার কম। এই ৩০% মূল্যের পার্থক্য বৈশ্বিক শিপিং রুটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।
সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় মেয়ার্স্কের (Maersk) মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ফুজাইরাহতে লেনদেনের পরিমাণ কোভিড-১৯ মহামারীর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সিঙ্গাপুরের অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত অস্থিরতার কারণে নতুন কোনো অর্ডার নিতে ভয় পাচ্ছেন।
মানবিক সংকটের অশনিসংকেত
জ্বালানির এই অগ্নিমূল্য সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। সামুদ্রিক গ্যাস অয়েলের (MGO) দাম সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রায় ১৬০% বেড়েছে। এর ফলে পণ্য পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) গভীর উদ্বেগ :
খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি: হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সার (Fertilizer) সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন কমিয়ে খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি: ডাব্লিউএফপি সতর্ক করেছে যে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আফ্রিকার কিছু অংশে চরম ক্ষুধা বা দুর্ভিক্ষের হার ২০% এবং এশিয়ায় ২৫% বৃদ্ধি পেতে পারে।
আমদানিনির্ভর দেশ: সুদানের মতো দেশগুলো, যারা খাদ্যের জন্য আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা কেবল জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ পথ নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।