এভিয়েশন ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাত বৈশ্বিক এভিয়েশন সেক্টরে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ২৬ মার্চ ২০২৪-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং আর্থিক ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে আকাশপথের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল এবং মার্কিন সামরিক উত্তেজনার ফলে এভিয়েশন শিল্প এখন কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নিয়মিত রুট পরিবর্তন, ফ্লাইট বাতিল এবং ক্রমবর্ধমান অপারেশনাল খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো।
১. রুট সংকোচন ও আকাশপথ বন্ধের হিড়িক
সংঘাতের কেন্দ্রস্থল ইরান, ইরাক এবং ইসরায়েলের আকাশপথ বর্তমানে বাণিজ্যিক বিমানের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
লুফথানসা ও ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ: জার্মানির লুফথানসা গ্রুপ এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ তেহরান, তেল আবিব এবং বৈরুতে তাদের ফ্লাইট আগামী মে মাসের শেষ পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজ: মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাব হিসেবে পরিচিত দুবাই ও দোহার এয়ারলাইনসগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। গত কয়েক সপ্তাহে এমিরেটস তাদের রুট নেটওয়ার্ক প্রায় ৩০% কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।
জিপিএস স্পুফিং এবং মিসাইল হামলার আশঙ্কায় অনেক এয়ারলাইনস এখন সৌদি আরব ও মিশরের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করছে।
২. ফ্রেইট বা কার্গো ব্যবসায় উল্লম্ফন
যাত্রীবাহী বিমানে মন্দা দেখা দিলেও কার্গো বা ফ্রেইট ব্যবসায় ব্যাপক তেজি ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ায় অনেক আমদানিকারক এখন সমুদ্রপথ ছেড়ে আকাশপথ বেছে নিচ্ছেন।
ব্যয় বৃদ্ধি: গত এক মাসে এশিয়া থেকে ইউরোপের রুটে এয়ার ফ্রেইট রেট প্রায় ৫৫% থেকে ৭০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
জরুরি পণ্য: বিশেষ করে ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স এবং পচনশীল পণ্যের জন্য এয়ার কার্গোর চাহিদা এখন তুঙ্গে, যা এয়ারলাইনসগুলোর আয়ের একটি বিকল্প উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. অপারেশনাল খরচ ও টিকিটের দাম
দীর্ঘ রুট ব্যবহারের ফলে জ্বালানি খরচ এবং বিমার প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হয়েছে।
জ্বালানি খরচ: রুট পরিবর্তনের কারণে একটি ফ্লাইটকে এখন অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আকাশে থাকতে হচ্ছে, যার ফলে জ্বালানি খরচ বেড়েছে গড়ে ১৫-২০%।
টিকিটের দাম: যাত্রীদের ওপর এই খরচের বোঝা সরাসরি চাপানো হচ্ছে। ঢাকা-লন্ডন বা দিল্লি-নিউইয়র্কের মতো জনপ্রিয় রুটে টিকিটের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪. বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও ভবিষ্যৎ
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ মনিটর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন যে চলমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক ছোট এয়ারলাইনস দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তবে কাতার এয়ারওয়েজ বা টার্কিশ এয়ারলাইনসের মতো বড় সংস্থাগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছে। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (DXB) সীমিত পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালু রাখলেও ট্রানজিট যাত্রীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ইরান-ইসরায়েল সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এটি বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত আকাশপথকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আগামী কয়েক মাস বিশ্ব এভিয়েশনের জন্য অত্যন্ত সংকটকাল হিসেবে বিবেচিত হবে।










