Home কর্পোরেট তোয়াজের সাম্রাজ্য: যখন তেলের নিচে চাপা পড়ে মেধা

তোয়াজের সাম্রাজ্য: যখন তেলের নিচে চাপা পড়ে মেধা

অফিস রাজনীতি-১

মো. আজগর আলী

অফিস — চার দেয়ালের মাঝে বন্দি এক যান্ত্রিক জীবন। যেখানে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিম্নস্তরের কর্মী, সবাই প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের মেধা আর শ্রম ঢেলে দেন। কিন্তু এই দৃশ্যমান কর্মব্যস্ততার আড়ালে চলে এক অদৃশ্য ক্ষমতার খেলা। যে খেলার নাম ‘অফিস রাজনীতি’। এখানে অনেক সময় ডিগ্রি বা কাজের দক্ষতা গৌণ হয়ে পড়ে, মুখ্য হয়ে ওঠে ওপরতলার কর্তাদের তুষ্ট রাখার ক্ষমতা।
এই তোয়াজের সংস্কৃতি কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়, তা নিয়ে আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।
শহরের এক নামী করপোরেট অফিসের সাবেক মানবসম্পদ কর্মকর্তা কামরুল হাসান (ছদ্মনাম) তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে গিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বলছিলেন, যোগ্য কর্মীরা যখন দেখেন তাদের সারা বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির চেয়ে বসের ব্যক্তিগত ইগো তুষ্ট করা সহকর্মীর কদর বেশি, তখন তাদের কাজের স্পৃহা মরে যায়।
অনেক বড় বাবু বা সিনিয়র কর্মকর্তা চান না তাদের অধীনস্থরা শুধু নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করুক; বরং তারা চান একদল অনুগত বাহিনী, যারা সবসময় তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকবে।
এই মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাই অফিসে একটি বিশেষ ‘প্রিয়ভাজন’ গ্রুপ তৈরি করে। এই গ্রুপের সদস্যরা কাজের দিক থেকে যতই অদক্ষ বা ফাঁকিবাজ হোক না কেন, বড় বাবুর কাছে তারা সবসময়ই ‘অসাধারণ’ হিসেবে গণ্য হন।
কর্তাবাবুর স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠত্ব: অফিসে এমন কিছু কর্তাবাবু থাকেন, যারা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের যোগ্যতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তিনিই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র কাণ্ডারি। তার ভাবখানা এমন যে, বাকিরা সব ‘তামাকের ঠোঙা’; অর্থাৎ তাদের কোনো মূল্য নেই।
তিনি মালিকপক্ষকে বোঝাতে চান যে, একদল অযোগ্য আর অথর্ব লোক নিয়ে তাকে একাই যুদ্ধ করে কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। অথচ বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী সেই অফিসেই রয়েছেন। বড় বাবু অত্যন্ত সুকৌশলে সেসব মেধাবীদের অস্তিত্ব গোপন রাখেন এবং তাদের সবসময় ‘অকর্মণ্য’ হিসেবে কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেন, যাতে মালিকের মনে ওই কর্মীদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কর্মক্ষেত্র বিষয়ক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য বা তোয়াজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি এক ধরনের ‘অদৃশ্য দুর্নীতি’। যেখানে লেনদেনটা টাকার অংকে হয় না, হয় তোয়াজ আর তেলের বিনিময়ে। এর ফলে যারা সত্যি কাজ করতে চান, তারা ক্রমে ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকেন। তাদের ছোটখাটো ভুলগুলো বড় বাবুর ডায়েরিতে সযত্নে নোট করা হয়, অথচ প্রিয়ভাজনদের বিশাল বিশাল গাফিলতি অবলীলায় এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, যোগ্য কর্মীরা বছরের পর বছর একই পদে পড়ে থাকেন, আর তেলবাজরা লিফট দিয়ে তরতরিয়ে ওপরে উঠে যান।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ব্যবস্থাপক রাজিয়া সুলতানা নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, মালিকপক্ষ বা উচ্চতর ব্যবস্থাপনা যখন অফিসের দৈনন্দিন খুঁটিনাটি খবর রাখেন না, তখনই এই মধ্যম সারির বড় বাবুদের ক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তারা মালিকের কান ভারী করতে পারদর্শী হন এবং শুধু নিজেদের গ্রুপের সুনাম প্রচার করেন। দক্ষ কর্মীরা তখন এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যান।
রাজিয়া সুলতানের মতে, এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো পারফরম্যান্সের এক স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং নেতৃত্বের মানসিক পরিবর্তন। যতদিন না বড় বাবুরা নিজেদের ইগোর চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে বড় করে দেখবেন, ততদিন এই অন্ধকার খেলা চলতেই থাকবে। মেধা যেখানে অবহেলিত, সেখানে প্রগতি শুধু স্বপ্নই থেকে যায়।
এই প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনার মতামত কী? অফিস রাজনীতির এমন অভিজ্ঞতা কি আপনার কর্মজীবনেও ঘটেছে? আপনার মন্তব্য আমাদের জানান নিচের কমেন্ট বক্সে। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করুন।
 পরবর্তী পর্বে থাকছে: বড় বাবুর দাবার চাল ও বিভাজন নীতির ব্যবচ্ছেদ।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও করপোরেট জগতের নিয়মিত আপডেট পেতে ভিজিট করুন: 🌐 www.businesstoday24.com