Home Second Lead চট্টগ্রাম থেকে বিপিসি স্থানান্তরের নেপথ্যে কার স্বার্থ?

চট্টগ্রাম থেকে বিপিসি স্থানান্তরের নেপথ্যে কার স্বার্থ?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের নেপথ্য কাহিনী এবার পুরোপুরি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশের জ্বালানি খাতের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রামে বিপিসির সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানান্তর করা হলেও গত সাড়ে তিন দশকে তা কার্যত নামেই সীমাবদ্ধ ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের শীর্ষ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজধানীর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে চান না। আর কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে অনীহা’র মানসিকতাকে পুঁজি করেই এবার শুরু হয়েছে স্থায়ীভাবে সদর দপ্তর ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম ও অতি গোপনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, একটি বিশেষ নোটিশ এবং তার পরপরই মন্ত্রণালয়ের নজিরবিহীন ‘বিদ্যুৎ গতির’ চিঠি চালাচালির মাধ্যমে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ মে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী একটি জরুরি ও জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের প্রকাশ্য আবেদন জানান। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় বিপিসির একটি স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন।

সাধারণত যেকোনো জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ বা প্রস্তাবনার ওপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায় ও অংশীজনদের সাথে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও, বিপিসির ক্ষেত্রে তা ঘটেছে অলৌকিক গতিতে।

সংসদ সদস্যের নোটিশ প্রদানের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি আমলে নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। এরপর থেকেই মূলত আড়ালে-আবডালে থাকা স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ ডানা মেলতে শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গুরুত্ব দিতে এবং জ্বালানি খাতের মূল অবকাঠামো কাছাকাছি রাখতে বিপিসি চট্টগ্রামে আনা হয়। কিন্তু গত ৩৫ বছর ধরে সংস্থাটির বড় বড় কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে ঢাকাতেই লিয়াজোঁ অফিস বা অন্য কোনো নাম দিয়ে অবস্থান করে আসছিলেন। সপ্তাহে দু-একদিন অথবা মাঝেমধ্যে লোকদেখানো চট্টগ্রাম সফর করলেও তাদের মূল মনোযোগ ও যাতায়াত ছিল রাজধানী কেন্দ্রিক।

চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব আধুনিক বহুতল প্রধান কার্যালয় ভবন যখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়, ঠিক তখন কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে না চাওয়ার’ মানসিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সংসদ সদস্যের এই নোটিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এই অতি-তৎপরতা বলে উল্লেখ করেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক সৈয়দ সগির আহমেদ।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল ও নাগরিক সমাজ এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে একে ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে:

স্বার্থের সংঘাত: যেখানে সরকারের মূল নীতি বিকেন্দ্রীকরণ, সেখানে কর্মকর্তাদের আরাম-আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের স্বার্থে একটি পুরো জাতীয় সংস্থাকে ঢাকায় ফেরত নিয়ে যাওয়া চরম বৈষম্যমূলক।

কোটি কোটি টাকার অপচয়: চট্টগ্রামে যখন নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় প্রস্তুত, তখন আবার ঢাকায় নতুন করে স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকার চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র: বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের যে মর্যাদা ও গুরুত্ব, তা এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেটের কারণে বারবার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য দেশের পুরো জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে অপারেশনাল এরিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এই ‘বিদ্যুৎ গতির’ আত্মঘাতী প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করে বিপিসির পূর্ণাঙ্গ সদর দপ্তর সদ্য নির্মিত চট্টগ্রামের স্থায়ী ভবনেই কার্যকর করার দাবি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।