Home আন্তর্জাতিক নেপালের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার এমপি ভূমিকা শ্রেষ্ঠা

নেপালের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার এমপি ভূমিকা শ্রেষ্ঠা

ভূমিকা শ্রেষ্ঠা

বাধা পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায়

 রামেশ ভট্টরায়, কাঠমান্ডু:  দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষের অধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে ২০২৬ সালের মার্চ মাস নেপালের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ দেড় দশকের লড়াই শেষে দেশটির পার্লামেন্টে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভূমিকা শ্রেষ্ঠা। র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বালেন্দ্র শাহ-এর নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (RSP) থেকে তিনি এই ইতিহাস গড়েন।
শৈশব ও আত্মপরিচয়ের লড়াই: ১৯৮৮ সালে কাঠমান্ডুর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ভূমিকা। জন্মগতভাবে তাকে ‘ছেলে’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও শৈশব থেকেই তিনি অনুভব করতেন তার ভেতরের সত্তাটি একজন নারীর। এই আত্মপরিচয় প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে চরম সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় শুধুমাত্র নিজের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করার কারণে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই বাধা তাকে দমিয়ে দেয়নি, বরং সমাজের মূলধারায় অধিকার আদায়ের জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সামাজিক তৎপরতা ও ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটি: ২০০৭ সালে ভূমিকা শ্রেষ্ঠা নেপালের প্রভাবশালী এলজিবিটিকিউআই+ অধিকার সংস্থা ‘ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটি’-তে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি।
নাগরিকত্ব ও পাসপোর্টে স্বীকৃতি: নেপালে নাগরিকত্ব এবং পাসপোর্টে ‘অন্যান্য’ (Other) ক্যাটাগরি যুক্ত করার আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। তিনি প্রথম নেপালি ট্রান্সজেন্ডার নারী যিনি ‘অন্যান্য’ পরিচয়বাহী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।
মিস পিংক খেতাব: ২০০৭ সালে নেপালের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার বিউটি পেজেন্ট ‘মিস পিংক’-এ বিজয়ী হয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান, যা তাকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কথা বলার সুযোগ করে দেয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
ভূমিকা শ্রেষ্ঠার সাহসী লড়াই বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হয়েছে।
২০২২ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কারেজ’ (IWOC) অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
২০১৯ সালে তিনি বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকের তালিকায় স্থান পান।
রাজনীতি ও পার্লামেন্টে যাত্রা
২০২৬ সালের ৫ মার্চ নেপালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ভূমিকা শ্রেষ্ঠা রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (RSP) প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৬ মার্চ নেপালের নির্বাচন কমিশন তাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তিনি নেপালের ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভায় (Pratinidhi Sabha) সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হন।
নির্বাচনের পর আবেগাপ্লুত ভূমিকা বলেন, “আমাদের সংবিধানে অনেক অধিকারের কথা বলা আছে, কিন্তু সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সঠিক আইন ও নীতিমালা নেই। আমার সম্প্রদায়ের মানুষ আশা করে আমি পার্লামেন্টে তাদের হয়ে কথা বলব।”
পার্লামেন্টে ভূমিকার মূল লক্ষ্য হবে সমকামী বিয়ের পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতি, ট্রান্সজেন্ডারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করা। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এই বিজয় কেবল একটি সম্প্রদায়ের নয়, বরং পুরো নেপালের গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রার জয়।