খেলার মাঠে তিনি ছিলেন অপরাজেয় ‘কাপ্তান’, যিনি ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে এনে দিয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ। জনসেবার মাঠে তিনি শওকত খানম ক্যানসার হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা। আর রাজনীতির ময়দানে তিনি ‘কায়েদি নম্বর ৮০৪’। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। তোশাখানা, সাইফার বা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস এবং আল-কাদির ট্রাস্ট মামলাসহ ১৮০টিরও বেশি আইনি মামলার জালে আবদ্ধ এই ক্যারিশম্যাটিক নেতা।
কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে থেকেও কিভাবে তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তার বর্তমান জীবন কেমন কাটছে— তা নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
‘ডেথ সেল’ ও অন্ধকারের দিনলিপি
কারাগারের ভেতরে ইমরান খানের জীবনযাপন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে রয়েছে তীব্র উদ্বেগ। তার দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তাকে মূলত নির্জন কারাবাসে (Solitary Confinement) রাখা হয়েছে। একসময় বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই নেতাকে রাখা হয়েছে অত্যন্ত ছোট একটি সেলে, যেটিকে ইমরান খান নিজেই সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে “ডেথ সেল” বা মৃত্যু কূপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার স্বাস্থ্য। দীর্ঘ সময় সঠিক চিকিৎসাবঞ্চিত থাকার কারণে তার ডান চোখের রেটিনাল ভেইন ব্লকেজের ফলে দৃষ্টিশক্তির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, তিনি তার ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। যদিও পাকিস্তান সরকারের দাবি, তাকে কারাগারে জিমনেসিয়ামের সুবিধা এবং বিশেষ রাঁধুনির তৈরি খাবারসহ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তবে তার পরিবার ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে “অমানবিক বন্দিদশা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
আপসহীন কাপ্তান: পর্দার আড়ালের প্রস্তাব
কারাগারে থাকলেও ইমরান খানের রাজনৈতিক তেজ কমেনি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গুঞ্জন এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমান শাহবাজ শরীফের বেসামরিক সরকার এবং সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষ থেকে তোশাখানা-২ এবং আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় আইনি স্বস্তি দেওয়ার বিনিময়ে ইমরান খানকে পর্দার আড়ালে বড় ধরনের আপসের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইমরান খান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই সামরিক বাহিনীর সাথে আপস করবেন না বা দেশ ছেড়ে যাবেন না। বিশেষ করে ২০2৩ সালের ৯ মে সামরিক স্থাপনায় হামলার মামলার বিষয়ে তিনি কোনো সমঝোতায় আসতে নারাজ। এই আপসহীন মনোভাবই তাকে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অদম্য নায়কের আসনে বসিয়েছে।
বন্দিদশাতেও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ
পাকিস্তানের ইতিহাসে ইমরান খানই সম্ভবত প্রথম নেতা, যিনি সশরীরে মাঠে না থেকেও শুধু কারাগার থেকে পাঠানো বার্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির ভয়েস ক্লোনিং-এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তার দলকে একক বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। বর্তমানে দলের শীর্ষ নেতারা তার সাথে দেখা করার জন্য আদালতের দরজায় কড়া নাড়ছেন। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইয়াহিয়া আফ্রিদি ঈদুল আজহার পরপরই ইমরান খানের সঙ্গে তার পরিবার, আইনজীবী এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সাক্ষাতের আবেদন শুনানির আশ্বাস দিয়েছেন।
ইমরান খানের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী বুশরা বিবি এবং দলের বর্তমান চেয়ারম্যান গোহর আলি খান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখলেও, দলের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের সুতা এখনো আদিয়ালা জেলের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকেই নড়ছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমরান খানকে মাইনাস করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা অসম্ভব। একদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি, অন্যদিকে বর্তমান সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ (যেমন- নতুন সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি)— সব মিলিয়ে দেশটিতে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ চলছে।
ইমরান খানকে কতদিন এভাবে বন্দী রাখা যাবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে পাকিস্তানের সমকালীন ইতিহাসে তিনি এমন এক “কায়েদি”, যিনি জেলের ভেতর থেকে দেশের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামরিক এস্টাবলিশমেন্টকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। খেলার মাঠের মতো রাজনীতির মাঠেও এই ‘লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিং’ লড়াইয়ে ইমরান খান শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।