নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাচ্ছেন রহিমা বেগম। মাথায় খালি কলস, পায়ে কাদামাটি। একসময় এই নদীর পানি ছিল মিষ্টি, এখন তা লবণাক্ত। সুপেয় পানির খোঁজে তাকে প্রতিদিন হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল।
রহিমার এই পথচলা শুধু তার ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটের প্রতিচ্ছবি—জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট। জ্বালানি, খাদ্য, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার জালে আটকে গেছে বিশ্ববাসী, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রহিমার মতো দরিদ্র মানুষেরা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: যুদ্ধ, জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন ও উৎপাদন খরচে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করছে—এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধীরগতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে খাদ্যদ্রব্যের দাম, বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিল। উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল—সবখানেই সাধারণ মানুষ পড়েছে চাপে।
গ্রামের বাজারে তার প্রতিফলন
চরের ছোট বাজারে গিয়ে রহিমা বেগম দাঁড়িয়ে থাকেন দীর্ঘক্ষণ। হাতে গোনা কিছু টাকা। চাল, ডাল, তেল—সব কিছুর দাম যেন প্রতিদিনই বাড়ছে।
“আগে ৫০০ টাকায় যা কিনতাম, এখন ১০০০ টাকায়ও হয় না,”—বললেন তিনি।
তার স্বামী একজন দিনমজুর। কাজ কমে গেছে, আয়ও অনিশ্চিত। সংসারে তিন সন্তান। একবেলা খাবার জোটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জলবায়ুর আঘাত: অদৃশ্য কিন্তু গভীর
রহিমার জীবনে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে—আবহাওয়ার আচরণে। বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা—সব মিলিয়ে কৃষি উৎপাদন কমে গেছে। যে জমিতে একসময় ধান হতো, এখন সেখানে ফসল ফলানো কঠিন। ফলে খাদ্য সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়—এটি সরাসরি অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে।
বৈষম্যের বেড়াজাল
এই সংকটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর প্রভাব সবার ওপর সমান নয়। ধনী দেশ বা উচ্চ আয়ের মানুষ যেখানে কিছুটা সামাল দিতে পারছে, সেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠী পড়ছে চরম বিপাকে। রহিমা বেগমদের মতো মানুষ, যারা বৈশ্বিক সংকট তৈরিতে প্রায় কোনো ভূমিকা রাখেনি, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
সংকটের জটিল সম্পর্ক
বর্তমান পরিস্থিতি একটি চক্রের মতো কাজ করছে—
- যুদ্ধ → জ্বালানি সংকট → পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি
- পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → খাদ্যের দাম বৃদ্ধি
- জলবায়ু পরিবর্তন → উৎপাদন কম → খাদ্য সংকট
- সব মিলিয়ে → মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি
- এই চক্র ভাঙা না গেলে সংকট আরও গভীর হবে।










