জীবনের রিপোর্টার
কামরুল ইসলাম:
চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে কত শত ধুলোওড়া অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করেছি, কত সহস্র ঘটনার সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের পাতা উল্টেছি, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কিছু অ্যাসাইনমেন্ট অবাধ্য পেরেকের মতো মানুষের জীবনের খেরোখাতায় চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে থেকে যায়; চাইলেও তাদের উপড়ে ফেলা যায় না।
আজ থেকে দীর্ঘ চার দশক আগে, ১৯৮৩ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়লে থমকে যাওয়া ট্রেনের মতো স্মৃতির চাকা হঠাৎ করেই সচল হয়ে ওঠে। মনের জানালায় হুড়মুড় করে এসে পড়ে পথেরহাটের সেই চেনা ধুলোবালি। আমি তখন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক সংবাদ’-এর এক তরুণ, টগবগে স্টাফ রিপোর্টার। সে সময়ে ‘সংবাদ’ কেবল কাগজের বুকে কালির অক্ষরে ছাপা কোনো সাধারণ দৈনিক পত্রিকা ছিল না; সেটি ছিল এদেশের প্রগতিশীল, বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং দ্রোহী বুদ্ধিজীবীদের বুক ফুলিয়ে লড়াই করার একমাত্র অকুতোভয় মুখপত্র, আর আমাদের মতো তরুণ সাংবাদিকদের জন্য এক একটা জেনারেটর!
একদিন হঠাৎ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বজলুর রহমান আমাকে জরুরি একটি অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন। রাজনৈতিক মহলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে তাঁর কাছে খবর পৌঁছেছিল— রাউজানের নোয়াপাড়ায় পথেরহাটের কাছে খোদ মাস্টারদা সূর্য সেনের ঐতিহাসিক পৈতৃক ভিটেটি জবরদখল করার এক নগ্ন নীল নকশা চলছে। সরেজমিনে গিয়ে রিপোর্ট করতে বললেন। আরও বললেন, ‘‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপানো বীরের শেষ স্মৃতি আমরা এভাবে মুছে যেতে দিতে পারি না।”
অ্যাসাইনমেন্টটি পাওয়ার পর মূল অনুসন্ধানে নামার আগে ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্যের জন্য আমি যোগাযোগ করি চট্টগ্রামের তৎকালীণ খ্যাতিমান সাংবাদিক নেতা অঞ্জন কুমার সেন-এর সাথে। তিনি আমাকে সাথে করে শহরের একটি বাসায় অবস্থানরত বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর কাছে নিয়ে যান। জালালাবাদ যুদ্ধের এই বীর সেনানি তখন চট্টগ্রামের প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রধান অভিভাবক। শহরের সেই বাসায় বসে বিনোদ বাবুর সাথে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়। তিনি আমাকে মাস্টারদার পৈতৃক ভিটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর পেছনে থাকা আবেগের গভীরতা বুঝিয়ে দেন, যা আমার ভেতরের রিপোর্টার সত্তাকে আরও তাতিয়ে দিয়েছিল।
বিনোদ বাবুর কাছ থেকে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে পরদিনই আমি রওনা হলাম রাউজানের নোয়াপাড়ার উদ্দেশ্যে। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মতো ছিল না। পথেরহাটে বাস থেকে নেমে ধুলোওড়া মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে যখন মাস্টারদার পৈতৃক ভিটায়, সেনপাড়ায় পৌঁছালাম, বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সেখানে কোনো স্মারক ছিল না, ছিল না কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। আমার চোখের সামনে তখন কেবল এক টুকরো শূন্য ভিটে। আশেপাশে কিছু মাটির হাঁড়িভাঙ্গা। কোনো স্থায়ী স্থাপনা তখনও গড়ে ওঠেনি, কিন্তু চারিদিকে দখলের এক অশুভ প্রস্তুতি টের পাওয়া যাচ্ছিল।
সেদিন এই অচেনা ও থমথমে এলাকায় আমার জন্য মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। কিন্তু স্থানীয়ভাবে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল এক সাহসী তরুণী— ছবি ধর। সে সময়ে সে ছিল স্থানীয় কলেজের উদ্যমী এক ছাত্রী। ছবি ধরের অকুতোভয় সহযোগিতা আর চেনা গণ্ডির সূত্র ধরেই আমি এলাকার ভেতরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলাম (যিনি পরবর্তীতে রূপালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন)।
ছবি ধরের সাহচর্যে আমি ওখানকার সেই ভিটেমাটির একদম কাছাকাছি বসবাসকারী স্থানীয় সাধারণ মানুষ, আর প্রবীণ বাসিন্দাদের সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। মূলত এই সাধারণ মানুষগুলোই আমাকে ভেতরের আসল সত্যটা জানান।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সত্তরের দশকের শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই গিয়ে অঢেল টাকা কামানো এক স্থানীয় প্রভাবশালী ‘দুবাইওয়ালা’র নজর পড়েছে এই ঐতিহাসিক পরিত্যক্ত ভূমির ওপর। বিপুল অর্থের গরম, পেশিশক্তি আর ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে ভুয়া কাগজপত্র ও বায়া দলিল তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনা ছিল, বিপ্লবীর এই শূন্য ভিটেটি চিরতরে গ্রাস করে সেখানে নিজেদের দালানকোঠা তুলে ইতিহাসের চিহ্নটুকুও মুছে দেওয়া হবে।
ভিটেমাটির কাছের সাধারণ মানুষগুলোই দুবাইওয়ালার জবরদখল তৎপরতার ভেতরের সমস্ত গোপন কূটকৌশল, প্রমাণাদি দিয়ে আমার রিপোর্টের মূল ভিত্তিটি গড়ে দিয়েছিলেন।
ফিরে এসেই লিখে ফেললাম সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ‘দৈনিক সংবাদ’-এর তৃতীয় পৃষ্ঠায় ছাপা হলো আমার সেই ঐতিহাসিক রিপোর্ট— “যার ভয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কাঁপতো, সেই মাস্টারদার ভিটে দখলে তৎপর দুবাইওয়ালা।”
পত্রিকায় রিপোর্টটি প্রকাশের পর যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটল। প্রগতিশীল রাজনীতির মুখপত্র ‘সংবাদ’-এর এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। নোয়াপাড়ার আপামর সাধারণ মানুষ মেতে উঠলেন ক্ষোভে। খবরটি পৌঁছামাত্রই চট্টগ্রামের প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ, যুব ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত সংস্কৃতিকর্মীরা গর্জে উঠলেন। গঠিত হয় প্রতিরোধ কমিটি। রাজপথে মিছিল, সমাবেশ আর বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত নস্যাৎ হয়ে যায় সেই দুবাইওয়ালার চক্রান্ত।
গণমাধ্যমের লাগাতার চাপ এবং স্থানীয়দের এই তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রশাসন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলো। যতটুকু মনে পড়ে, তদন্তে দুবাইওয়ালার তৈরি করা সমস্ত দাবি এবং দলিলপত্র ভুয়া ও অবৈধ প্রমাণিত হয়েছিল।











