রাত তখন গভীর। বাইরে ঝোড়ো হাওয়া বইছে, যার শব্দে পুরনো বাংলোর জানলাগুলো মাঝেমধ্যে কেঁপে উঠছে। অনির্বাণ তার টেবিলের ওপর রাখা মোমবাতিটা ঠিক করে বসাল। সামনে খোলা ম্যানেজার রাজীব মল্লিকের সেই ধুলোমাখা ডায়েরি।
ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতেই অনির্বাণের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। প্রথম দিকের লেখাগুলো ছিল সাধারণ—বাগানের হিসাব, শ্রমিকদের পাওনা আর আবহাওয়ার কথা। কিন্তু মাঝামাঝি আসার পর থেকে হাতের লেখাগুলো কেমন যেন অস্থির আর অগোছালো হয়ে গেছে।
একটি পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা: “ওরা মাটির নিচ থেকে কথা বলে। পাহাড় দেবতা আসলে রক্ষা করেন না, তিনি পাহারা দেন। নীলকণ্ঠের নীল আসলে বিষের রঙ।”
অনির্বাণ পাতা ওল্টাতে লাগল। হঠাৎ একটি পাতায় সে দেখল অদ্ভুত কিছু জ্যামিতিক নকশা আর সংকেত। তার নিচে লেখা— ‘উত্তরের সেই প্রাচীন পাথরের নিচে যেখানে ছায়া বাঁক নেয় পশ্চিমে’। অনির্বাণ বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়, এটা আসলে একটা ম্যাপ বা কোনো গুপ্ত পথের হদিশ।
হঠাৎ ডায়েরির ভেতর থেকে ভাজ করা একটা পুরনো হলদেটে কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল। অনির্বাণ ওটা তুলে মেলে ধরল। ওটা একটা হাতে আঁকা ম্যাপ, যাতে বাগানের উত্তর সীমানার সেই নিষিদ্ধ জঙ্গল আর মন্দিরের ছবি দেওয়া আছে। কিন্তু মানচিত্রের এক কোণে একটা ছোট গোল চিহ্ন দিয়ে লেখা— ‘গহ্বর-১৩’।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল। পুরো ঘর নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল। অনির্বাণ পকেট থেকে টর্চ বের করতে যাবে, তখনই সে অনুভব করল—ঘরের ভেতর অন্য কারোর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কেউ একজন তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
“কে? রতন কাকু?” অনির্বাণ কাঁপা গলায় ডাকল।
কোনো উত্তর এল না। হঠাৎ জানলার পাল্লাটা সশব্দে খুলে গেল এবং এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকল। অনির্বাণ টর্চ জ্বালিয়ে দেখল ঘর পুরো খালি। কিন্তু ডায়েরিটা যেখানে ছিল, সেখানে সেটা আর নেই! কে যেন নিমেষের মধ্যে ওটা টেবিল থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
অনির্বাণ জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। কুয়াশাচ্ছন্ন বাগানে একটি ছায়া দ্রুত পায়ে জঙ্গলের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। অনির্বাণ বুঝতে পারল, এই লড়াইটা এখন আর শুধু তার একার নয়। কেউ একজন চায় না রাজীব বাবুর রহস্যের সমাধান হোক।
ডায়েরিটা হাতছাড়া হলেও ম্যাপটা এখনো অনির্বাণের হাতে ধরা। কাল সকালেই তাকে সেই ‘গহ্বর-১৩’ এর সন্ধানে বের হতে হবে। কিন্তু সে কি জানত, পাহাড়ের গভীরে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে?