Home আন্তর্জাতিক সোমালি উপকূলে জলদস্যুদের নতুন থাবা: জিম্মি আরও একটি জাহাজ

সোমালি উপকূলে জলদস্যুদের নতুন থাবা: জিম্মি আরও একটি জাহাজ

শিপিং ডেস্ক:
এক দশকেরও বেশি সময় স্তিমিত থাকার পর সোমালীয় জলদস্যুরা আবারও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারির সুযোগ নিয়ে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই করছে সশস্ত্র জলদস্যু গোষ্ঠীগুলো। সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী, এবার জলদস্যুদের কবলে পড়েছে ‘এমভি সোয়ার্ড’ (MV Sward) নামক একটি পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ।
গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি সোয়ার্ড’ জলদস্যুদের কবলে পড়ার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। সোমালি উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই অপহরণের ঘটনা ঘটে।
ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) নিশ্চিত করেছে যে, একদল সশস্ত্র ব্যক্তি জাহাজটিতে আরোহণ করে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে সেন্ট্রাল সোমালি উপকূলের দিকে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। ৪,০০০ ডেডওয়েট টন ওজনের এই জাহাজটি মূলত পূর্ব আফ্রিকার বাজারের জন্য বিভিন্ন শিল্প ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে মোম্বাসা বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। বর্তমানে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী জাহাজটিকে ট্র্যাক করছে এবং এটি দস্যুদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ‘ইল’ (Eyl) বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন এই আকস্মিক উত্থান?
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর মনোযোগ উত্তর দিকে সরে যাওয়ায় ভারত মহাসাগরে একটি ‘নিরাপত্তা শূন্যতা’ তৈরি হয়েছে। ইইউএনএভিএফওআর আটলান্টা (EUNAVFOR ATALANTA) এবং অন্যান্য যৌথ টাস্কফোর্সের যুদ্ধজাহাজগুলো এখন লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকায় সোমালি উপকূল অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে দস্যু গোষ্ঠীগুলো।
অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে মোম্বাসা ও পূর্ব আফ্রিকা
এমভি সোয়ার্ড ছিনতাইয়ের ঘটনা কেনিয়া এবং গ্রেট লেক অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক হুমকি। মোম্বাসা বন্দর দিয়ে উগান্ডা, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান এবং কঙ্গোর প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি পণ্য পরিবাহিত হয়। জলদস্যুতা বৃদ্ধি পেলে বীমা প্রিমিয়াম বা ‘ওয়ার রিস্ক’ সারচার্জ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এতে মোম্বাসায় আসা প্রতি কন্টেইনারে ৪০০ থেকে ১,২০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ বাড়তে পারে, যা সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে।
দস্যুদের কৌশলগত পরিবর্তন
এবারের দস্যুতা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত। তারা এখন ‘মাদার শিপ’ হিসেবে পরিচিত বড় মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করছে, যা থেকে ছোট ছোট স্পিডবোট নিয়ে উপকূল থেকে কয়েকশ মাইল দূরে গিয়েও আক্রমণ চালানো সম্ভব হচ্ছে।
এমভি রুয়েন এবং এমভি আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক সফল অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় স্থানীয় দস্যু নেটওয়ার্কগুলোকে নতুন করে উৎসাহিত করেছে।
একনজরে
  • জাহাজের নাম: এমভি সোয়ার্ড (MV Sward)
  • পতাকাবাহী রাষ্ট্র: সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস
  • পণ্য: মিশ্র শিল্প ও ভোগ্যপণ্য
  • ক্রু সদস্য: ১৫-১৮ জন (বিভিন্ন দেশের নাগরিক)
  • শেষ অবস্থান: মোগাদিশু থেকে ৬০০ নটিক্যাল মাইল পূর্বে
কেনিয়া মেরিটাইম অথরিটি এবং কেনিয়া নেভি ইতিমধ্যে উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে। জাহাজ মালিকদের সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষী ব্যবহার এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জাহাজের গতি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভারত মহাসাগরকে একসময় ‘জলদস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতি আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অনার-২৫ ছিনতাইয়ের রেশ কাটেনি
উল্লেখ্য, এমভি সোয়ার্ড ছিনতাইয়ের ঠিক আগেই গত সপ্তাহে জ্বালানি তেলের ট্যাংকার ‘অনার ২৫’ (Honour 25) ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, যা এর আগেই বিজনেসটুডে২৪-এ বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। পালাউ-এর পতাকাবাহী ওই ট্যাংকারটি ১৭ জন ক্রুসহ বর্তমানে হাফুন ও বান্দর বেইলা এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পর পর দুটি বড় জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা (High Alert) জারি করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এডেন উপসাগর ও সোমালি বেসিন দিয়ে চলাচলকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সন্দেহজনক কোনো গতিবিধি লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিক রিপোর্ট করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমও (IMO)।