আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: বৃটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ব্রিটিশ বাংলাদেশি ফরহাদ হোসেন। রাজধানী লন্ডনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা নিউহাম কাউন্সিলের মেয়র হিসেবে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। ৭ মে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিজয়ের মাধ্যমে নিউহামের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন।
নির্বাচনী মাঠের শুরু থেকেই ফরহাদ হোসেনকে নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তিনি বৃটেনের মূলধারার কোনো বড় রাজনৈতিক দল (লেবার পার্টি) থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি। এর আগে টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান স্বতন্ত্র বা ভিন্ন ধারার রাজনীতিতে ইতিহাস গড়লেও ফরহাদ হোসেনের এই জয় মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের প্রভাব আরও সুসংহত করল।
১৯৬৫ সালে নিউহাম কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এটি বরাবরই লেবার পার্টির শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ফরহাদ হোসেন কেবল নিজের জয় নিশ্চিত করেননি, বরং এই অঞ্চলের প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার এই কৃতি সন্তান তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিউহামের নাগরিকদের সেবা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ফরহাদের এই বিজয় লন্ডনের স্থানীয় রাজনীতিতে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
লন্ডনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ফরহাদ হোসেনের এই ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে বইছে উৎসবের আমেজ। নিউহামের গ্রিন স্ট্রিট থেকে শুরু করে ইস্ট হামের বাঙালি পাড়াগুলোতে এখন এটিই প্রধান আলোচনার বিষয়। ফরহাদ হোসেনের এই জয়কে প্রবাসীরা তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।
নিউহামের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই কাউন্সিলে বসবাস করছি। নিউহামে বাংলাদেশিদের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও মূলধারার বড় দল থেকে মেয়র হিসেবে কাউকে পাওয়ার আক্ষেপ ছিল আমাদের। ফরহাদ হোসেন সেই আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন। তিনি আমাদের কাছের মানুষ এবং আমাদের সমস্যাগুলো বোঝেন। আশা করি তিনি নিউহামের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবেন।”
পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনের একটি রেস্তোরাঁয় আলাপকালে লুতফুর রহমান নামের এক প্রবাসী তরুণ জানান, “এটি কেবল একটি জয় নয়, এটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। লুৎফুর রহমান টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাস গড়েছিলেন, আর ফরহাদ হোসেন লন্ডনের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় সেই জয়ের পতাকা ওড়ালেন। এর মাধ্যমে বৃটেনের মূলধারার রাজনীতিতে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো।”
সিলেট কমিউনিটির নেতা এম এ রহিম বলেন, “বালাগঞ্জের সন্তান হিসেবে ফরহাদ হোসেনের এই সাফল্য আমাদের জন্য গর্বের। লন্ডনের রাজনীতিতে একজন বাংলাদেশির এই শীর্ষস্থানে পৌঁছানো প্রমাণ করে যে, মেধা ও শ্রম থাকলে এই দেশে যেকোনো উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব।” প্রবাসীদের প্রত্যাশা, ফরহাদ হোসেন কেবল বাংলাদেশিদের জন্যই নয়, নিউহামের সকল জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের অধিকার আদায়ে সমানভাবে কাজ করে যাবেন।
নবনির্বাচিত মেয়র ফরহাদ হোসেনের বর্ণাঢ্য জীবন ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
পেশাগত ও শিক্ষাগত জীবন
নিউহামেই বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনা করা ফরহাদ হোসেন পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। বিশেষ করে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং টিমে কাজ করেছেন। এই কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা তাকে বড় পরিসরের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বিবর্তন
তিনি নিউহাম কাউন্সিলের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্লাস্টো নর্থ (Plaistow North) এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে তিনি কাউন্সিলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে কমার্শিয়াল অপরচুনিটি, ক্রাইম এবং অ্যান্টি-সোশ্যাল বিহেভিয়ার বিষয়ক ক্যাবিনেট সদস্যের দায়িত্ব। এ ছাড়া তিনি অডিট ও পেনশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদে তিনি এক সময় লেবার পার্টি ছেড়ে রেসপেক্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে পুনরায় লেবার পার্টিতে ফিরে আসেন এবং বর্তমানে একজন বাস্তববাদী (Pragmatist) রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।
ব্যক্তিগত জীবন ও ক্রীড়ানুরাগ
ব্যক্তিগত জীবনে ফরহাদ হোসেন বিবাহিত এবং দুই কন্যাসন্তানের জনক। রাজনীতির বাইরে ক্রিকেটের প্রতি তার গভীর অনুরাগ রয়েছে। তিনি নিজে একজন দক্ষ অপেশাদার ক্রিকেটার। ক্রিকেট উন্নয়নের সাথেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত; তিনি এসেক্স ক্রিকেট ইন দ্য কমিউনিটি বোর্ড এবং ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট ট্রাস্টের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তার মেয়াদে নিউহামে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
ব্যক্তিত্ব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
সহকর্মী ও সাবেক কর্মীদের কাছে তিনি একজন অমায়িক, বুদ্ধিমান এবং মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে সমাদৃত। তবে মেয়র হিসেবে তার সামনের পথ বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে সেবা খাতের ব্যয় সংকোচন করে কাউন্সিলের বাজেট নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখা তার জন্য হবে একটি বড় পরীক্ষা।