Home Second Lead বাড়ছে জাহাজ ভাড়া: উদ্বেগে পোশাক শিল্প মালিকরা

বাড়ছে জাহাজ ভাড়া: উদ্বেগে পোশাক শিল্প মালিকরা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বিশ্বজুড়ে কন্টেইনার শিপিং বা সামুদ্রিক পণ্য পরিবহন খাতে নতুন করে অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে বৈশ্বিক শিপিং রুটে ‘প্রি-পিক সিজন’ শুরু হওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলো ভাড়ার ওপর বাড়তি মাশুল বা সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কন্টেইনার ভাড়া এখন পর্যন্ত তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সামনের দিনগুলোতে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকটা বেড়ে যেতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ভাড়ার চিত্র
২০২৬ সালের মে মাসের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ৪০ ফুট দীর্ঘ (FEU) কন্টেইনারের গড় ভাড়া বর্তমানে ২১০০ থেকে ২২০০ ডলারের মধ্যে  রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে এই দরে এক ধরনের স্থিতিশীলতা থাকলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট।

বিভিন্ন শিপিং কোম্পানিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলমান মে মাসের শেষ নাগাদ কার্যকর করার জন্য ‘জেনারেল রেট ইনক্রিজ’ (GRI) এবং ‘পিক সিজন সারচার্জ’ (PSS) আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মূলত উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে উৎসব ও ঋতুভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ার আগেই এই বাড়তি খরচ যোগ করা হচ্ছে। লজিস্টিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় যদি কোনো বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে, তবে এই ভাড়ার হার দ্রুত তিন হাজার ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর প্রভাব
বিশ্ববাজারে শিপিং খরচের এই সম্ভাব্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাবগুলো নিম্নরূপ:
  • উৎপাদন খরচ ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা: তৈরি পোশাকের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে লাভের মার্জিন খুব কম থাকে। কন্টেইনার ভাড়া এবং সারচার্জ বাড়লে পণ্যের ল্যান্ডিং কস্ট বা চূড়ান্ত খরচ বেড়ে যায়। ফলে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
  • লিড টাইম ও বুকিং জটিলতা: পিক সিজন শুরু হলে বড় বড় আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো সাধারণত বড় রপ্তানিকারকদের অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে বাংলাদেশের মাঝারি ও ক্ষুদ্র রপ্তানিকারকরা কন্টেইনার বুকিং পেতে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, যা সময়মতো পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বা ‘লিড টাইম’ বজায় রাখায় বড় বাধা হবে।
  • ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খরচ: মে মাসের শেষ নাগাদ ফ্রেইট রেট বাড়ার আশঙ্কায় স্থানীয় ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা ইতোমধ্যেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ভাড়া বেড়ে গেলে রপ্তানি বিলের পাশাপাশি লজিস্টিক খরচও বাড়বে, যা সরাসরি রপ্তানি আয়কে প্রভাবিত করবে।
  • কাঁচামাল আমদানিতে প্রভাব: বাংলাদেশ কেবল পণ্য রপ্তানিই করে না, পোশাক শিল্পের কাঁচামাল যেমন তুলা ও ফ্যাব্রিকও বিপুল পরিমাণে আমদানি করে। শিপিং রেট বৃদ্ধি পেলে আমদানিকৃত কাঁচামালের দামও বাড়বে, যা চূড়ান্ত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
শিপিং খরচ বৃদ্ধির খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিএমইএ-র একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও পোশাক শিল্প মালিক বলেন, “আমরা যখন বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে শিপিং ভাড়া বৃদ্ধি এবং নতুন করে সারচার্জ আরোপের খবর আমাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই কাঁচামালের দাম এবং উৎপাদন খরচ বেড়েছে, তার ওপর যদি মে মাসের শেষে কন্টেইনার ভাড়া আরও বাড়ে, তবে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য পাঠানো এবং কাঙ্ক্ষিত মুনাফা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই বাড়তি জাহাজ ভাড়ার বোঝা যদি আমাদেরই বইতে হয়, তবে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। আমরা এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং লজিস্টিক খরচ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি প্রত্যাশা করছি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের উচিত আগাম শিপমেন্ট বুকিং নিশ্চিত করা এবং প্রধান শিপিং লাইনগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির দিকে নজর দেওয়া। সেই সাথে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার মাধ্যমে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমিয়ে খরচ কিছুটা সাশ্রয় করা সম্ভব।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com