আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সোমালী জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত অয়েল ট্যাংকার ‘এমটি ইউরেকা’ (MT Eureka)-র মুক্তিপণ আদায়ের প্রক্রিয়াটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক রূপ নিয়েছে। জাহাজ ও ক্রুদের মুক্তির বিনিময়ে দস্যুরা এখন রেকর্ড ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) মার্কিন ডলার দাবি করছে। একই সাথে মালিকপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জিম্মি ক্রুদের খাবার ও পানির সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
মুক্তিপণ দাবি ও নির্মম দরকষাকষি
গত মে মাসের শুরুতে এডেন উপসাগর থেকে জাহাজটি ছিনতাই করার পর জলদস্যুরা প্রথমে ৩ মিলিয়ন (৩০ লাখ) মার্কিন ডলার দাবি করেছিল। তবে জাহাজের মালিকপক্ষ ও আন্তর্জাতিক বিমাকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা ধীরগতিতে চলায় দস্যুরা কৌশল পরিবর্তন করে। নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তারা একলাফে মুক্তিপণের অঙ্ক বাড়িয়ে ১০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। স্থানীয় উপজাতীয় প্রধানদের মাধ্যমে মাঝখানে এই অঙ্ক কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হলেও জলদস্যুরা বর্তমানে তাদের বর্ধিত দাবিতেই অনড় রয়েছে।
ক্রুদের মানবিক বিপর্যয় ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ
জাহাজে থাকা ক্রুদের পরিবারকে আতঙ্কিত করে মালিকপক্ষের কাছ থেকে দ্রুত টাকা আদায়ের কৌশল নিয়েছে জলদস্যুরা। অতি সম্প্রতি জাহাজের মিশরীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাদি তাঁর স্ত্রীর সাথে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ফোনে কথা বলার সুযোগ পান। সেই ফোনালাপের সূত্রে জানা গেছে, জাহাজে খাবার ও সুপেয় পানির মজুত শেষ হয়ে আসছে এবং জলদস্যুরা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রুদের জন্য তা অত্যন্ত সীমিত করে দিয়েছে। একই সাথে জাহাজের ডেকে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারাদারের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ক্রুদের ওপর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ট্র্যাকিং এড়াতে দস্যুরা জাহাজের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (AIS) বারবার অন ও অফ করছে।
যোগাযোগ ও মধ্যস্থতার চ্যানেল
জাহাজটি বর্তমানে সোমালিয়ার পান্টল্যান্ড অঞ্চলের ‘মুরকানিও’ নামক একটি উপকূলীয় মৎস্য গ্রামে নোঙর করে রাখা হয়েছে। জলদস্যুরা মূলত জাহাজের নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সোমালিয়ার স্থানীয় উপজাতীয় প্রবীণদের (Tribal Elders) মধ্যস্থতা চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করছে। যেহেতু জিম্মি ১২ জন ক্রুর মধ্যে ৮ জনই মিশরের নাগরিক, তাই মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মোগাদিশুতে অবস্থিত মিশরীয় দূতাবাস কোনো ধরনের সামরিক অভিযান না চালিয়ে আলোচনার মাধ্যমে রক্তপাতহীন সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে।
মার্শেল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ও গ্রিসের মালিকানাধীন (আরব আমিরাতের সংস্থায় চার্টার্ড) অয়েল ট্যাংকার এমটি ইউরেকা গত মে মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক নৌ-সহায়তা বলয় এড়িয়ে এডেন উপসাগর পার হওয়ার সময় সোমালী জলদস্যুদের ছোট স্পিডবোটের আক্রমণের শিকার হয়। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত দস্যুরা দ্রুত জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এটিকে পান্টল্যান্ডের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে সোমালী জলদস্যুদের পুনরুত্থান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক নৌবাহিনীগুলোর মনোযোগ লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের দিকে সরে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে সোমালী জলদস্যুরা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এমটি ইউরেকা ছিনতাইয়ের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো কতটা ভয়াবহ।