Home মিডিয়া পরিস্থিতির শিকার নাকি ব্যক্তিস্বার্থ? সাংবাদিকতায় নৈতিকতার চ্যুতি যেখানে

পরিস্থিতির শিকার নাকি ব্যক্তিস্বার্থ? সাংবাদিকতায় নৈতিকতার চ্যুতি যেখানে

আমিরুল মোমেনিন
সাংবাদিকতাকে বলা হয় সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় এই পেশার সংজ্ঞা ও মূল লক্ষ্য সবসময়ই অভিন্ন ও অপরিবর্তিত রয়েছে—যা হলো নির্ভীকভাবে সত্য প্রকাশ এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু সময়ের আবর্তে এবং বাস্তবতার কঠিন সমীকরণে এই মহৎ পেশার সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ নিজের অজান্তেই কিংবা সচেতনভাবে নীতিনৈতিকতার পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। ব্যক্তিস্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কিংবা বৈরী পরিস্থিতির কারণে কিছু সাংবাদিকের এই নৈতিকতার বিসর্জন সামগ্রিক গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অভিন্ন সংজ্ঞা ও নৈতিকতার ভিত্তি
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে বস্তুনিষ্ঠতা, সততা এবং নিরপেক্ষতার ওপর। যুগে যুগে প্রযুক্তির পরিবর্তন এসেছে, সংবাদের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু সাংবাদিকতার এই নৈতিক মানদণ্ডগুলো কখনো বদলে যায়নি।
একজন সাংবাদিকের প্রথম দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি। যেকোনো পরিস্থিতিতে সত্যকে আড়াল না করে তা সামনে আনাই এই পেশার মূল কথা। এই আদর্শকে ধারণ করেই বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
নীতিনৈতিকতা বিসর্জনের কারণ ও প্রেক্ষাপট
বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের এই নৈতিক স্খলনের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করে।
ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থনৈতিক লোভ: কেউ কেউ সাংবাদিকতার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন, প্রভাব প্রতিপত্তি খাটানো কিংবা অনৈতিক অর্থনৈতিক লাভের পেছনে ছোটেন। এই ব্যক্তিস্বার্থের কারণে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা মার খায়।
পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা: অনেক সময় বৈরী রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবেশ, আইনি জটিলতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে পড়ে সাংবাদিকরা আপস করতে বাধ্য হন। চাকরি বাঁচানো কিংবা শারীরিক নিরাপত্তার স্বার্থে সত্য প্রকাশে পিছপা হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ: পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর অনেক সময় সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষের করপোরেট বা রাজনৈতিক স্বার্থ চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় এবং নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়।
বিচ্যুতদের সংখ্যা কম, তবুও ক্ষতি সুদূরপ্রসারী
তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া এই ধরনের সাংবাদিকদের সংখ্যা সামগ্রিক পরিমাণের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। সিংহভাগ সাংবাদিকই এখনো চরম প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেদের পেশাগত সততা বজায় রাখছেন। স্বল্প বেতনে বা অনিয়মিত আয়ের মধ্যেও মাঠপর্যায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য সৎ সাংবাদিক।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ভার এসে পড়ে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর। একজন সাংবাদিকের একটি অসৎ পদক্ষেপ বা ভুল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ কোটি পাঠকের মনে সামগ্রিক গণমাধ্যমের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ফলে সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের লড়াইটাও আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
নৈতিকতা পুনরুজ্জীবনের আহ্বান
সাংবাদিকতার মহত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষকে আবার সেই অভিন্ন সংজ্ঞার মূলে ফিরে যেতে হবে। লোভ-লালসা ও ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা করা এখন সময়ের দাবি।
মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের অপেশাদারিত্বের কারণে যেন এই মহৎ পেশার গায়ে দাগ না লাগে, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উভয় স্তরেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com