Home চট্টগ্রাম ইট-পাথরের দালান আর রাজকীয় বিয়েতে উড়ছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা

ইট-পাথরের দালান আর রাজকীয় বিয়েতে উড়ছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা

সরেজমিন আনোয়ারা
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী টানেল পার হয়ে ওপাড়ে আনোয়ারা উপজেলার চাতরি ইউনিয়ন। সড়ক ধরে এগোলেই দুপাশে চোখ ধাঁধিয়ে দেবে একের পর এক বহুতল আধুনিক অট্টালিকা, নজরকাড়া ডুপ্লেক্স বাড়ি আর রাজকীয় মূল ফটক (গেইট)। মধ্যপ্রাচ্য ও ওমান-দুবাই প্রবাসীদের উপার্জিত টাকায় গত দুই দশকে এই এলাকার দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম অর্থনৈতিক অপচয়। রেমিট্যান্সের সিংহভাগ টাকাই এখানে আটকা পড়ে আছে ইট-পাথর-সিমেন্টের অনুৎপাদনশীল খামখেয়ালিতে, যা স্থানীয় বা জাতীয় অর্থনীতিতে কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করছে না।
সরেজমিন চিত্র: অনুৎপাদনশীল খাতের প্রতিযোগিতা
চাতরি,  বারখাইন, বটতলি, গুন্দ্বীপ, বারশত বা আশেপাশের এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রবাসীদের মধ্যে বাড়ি নির্মাণ ও জমি কেনার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। চার-পাঁচ তলা বিশিষ্ট একেকটি ভবনে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকলেও, সেগুলোর বেশিরভাগেরই ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে। মালিকরা বছরের বেশিরভাগ সময় বিদেশে থাকেন, আর দেশে থাকা পরিবারের দু-চারজন সদস্য বিশাল এই অট্টালিকা পাহারায় ব্যস্ত।
শুধু বাড়ি নির্মাণই নয়, প্রবাসীদের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে সামাজিক আভিজাত্য প্রদর্শনে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে তৈরি হচ্ছে বাড়ির সীমানা দেয়াল,  রাজকীয় গেইট। এছাড়া ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদিতে পানির মতো টাকা খরচ করা এবং হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে রাজকীয় মেজবানের আয়োজন করা এখন এই অঞ্চলের নিয়মিত সংস্কৃতি। একেকটি মেজবান ও বিয়েতে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা, যা স্রেফ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও প্রবাসীদের সাক্ষাৎকার
 মোহাম্মদ লোকমান (৫৫), ওমান প্রবাসী : “আমি ২৫ বছর ধরে ওমানে আছি। নিজের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে সাড়ে তিন গণ্ডা জমির ওপর চার তলা বাড়ি করেছি। প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখন ভাবি, এই টাকাটা যদি কোনো ফ্যাক্টরি বা ব্যবসায় খাটাতাম, তাহলে প্রতি মাসে একটা স্থায়ী আয় থাকত। বাড়ি থেকে তো কোনো লাভ আসছে না, উল্টো মেইনটেইন্যান্সের খরচ আছে। তখন আসলে এলাকার সবাইকে দেখে প্রতিযোগিতার বশে বাড়িটা করে ফেলেছিলাম।”
নাসিম উদ্দিন (৩২),  স্থানীয় তরুণ: “আমাদের এলাকায় প্রবাসীদের টাকা মূলত তিনটি খাতে যায়—জমি কেনা, বাড়ি বানানো আর বিয়ে বা মেজবানের পেছনে উড়ানো। একটা মেজবানে গরু জবাই করে লাখ লাখ টাকা খরচ করাকে এখানকার মানুষ সম্মান মনে করে। কিন্তু এই টাকা দিয়ে যে ১০ জন বেকার তরুণের কর্মসংস্থান করা যেত, সেই চিন্তা কেউ করে না।
কেন উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না রেমিট্যান্স?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের এই অনুৎপাদনশীল ব্যয়ের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে:
১. বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশের অভাব: প্রবাসীরা দেশে এসে কোনো ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান খুলতে গেলে নানা ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হন।
২. আর্থিক সচেতনতার অভাব: মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা আয় করলেও, সেই টাকা কীভাবে বন্ড, শেয়ার বাজার বা উৎপাদনশীল খাতে খাটানো যায়, সে বিষয়ে গ্রামীণ প্রবাসীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা নেই।
৩. সামাজিক মনস্তত্ত্ব: চট্টগ্রামের গ্রামীণ সমাজে এখনো জমি ও বিশাল বাড়িকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক মনে করা হয়।
অর্থনীতি বাঁচবে যেভাবে: বিশেষজ্ঞ মতামত ও দীর্ঘমেয়াদি পরামর্শ
 রেমিট্যান্সের এই বিশাল প্রবাহকে কীভাবে অনুৎপাদনশীল খাত থেকে সরিয়ে উৎপাদনশীল শিল্পে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত: “চট্টগ্রামের রেমিট্যান্সের টাকা যদি স্রেফ বাড়ি-গাড়িতেই আটকে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য কোনো সুফল আনবে না। প্রবাসীদের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে আনতে হলে সরকারকে বিশেষায়িত বন্ডের সুবিধা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।”
রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহারের জন্য যেসব কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে–
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবাসীদের অংশীদারিত্ব: চট্টগ্রামের মীরসরাই বা আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবাসীদের যৌথ বিনিয়োগের (Consortium) মাধ্যমে ছোট-বড় শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সুযোগ দিতে হবে। ৫ বা ১০ জন প্রবাসী মিলে একটি উৎপাদনমুখী প্রজেক্ট চালু করতে পারলে ঝুঁকি কমবে।
আর্থিক লিটারেসি বা সচেতনতা ক্যাম্পেইন: প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে রেমিট্যান্সের সঠিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাউন্সিলিং বা সচেতনতা সভা করা জরুরি। প্রবাসীদের বোঝাতে হবে, ডেড-অ্যাসেট (যেমন: খালি বাড়ি বা গেইট) কোনো আয় দেয় না, কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বংশপরম্পরায় লাভ দেয়।
প্রবাসী বন্ড ও সঞ্চয়পত্রে আকর্ষণীয় মুনাফা: ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড বা ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডের মতো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের প্রক্রিয়া গ্রামীণ প্রবাসীদের জন্য আরও সহজ এবং লাভজনক করতে হবে, যাতে তারা বাড়ি করার চেয়ে বন্ড কেনাকে নিরাপদ মনে করেন।
সহজ শর্তে লাইসেন্স ও নিরাপত্তা: কোনো প্রবাসী যদি স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য চাষ, কোল্ড স্টোরেজ বা বুটিক শিল্প করতে চান, তবে তাকে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’-এর মাধ্যমে দ্রুত লাইসেন্স দিতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের প্রবাসীদের পাঠানো রক্ত পানি করা টাকা স্রেফ ইট-পাথরের দেয়াল আর মেজবানের মাংস-ভাতে অপচয় না হয়ে যদি দেশের শিল্পায়নে ব্যবহৃত হয়, তবেই কেবল এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি টেকসই রূপ পাবে।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com