বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: শেয়ারবাজারে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে—”ভালো কোম্পানি চেনা সহজ, কিন্তু পচা শেয়ারে লাভ করা তার চেয়েও আকর্ষণীয়।” দেশের পুঁজিবাজারে মাঝে মাঝেই এমন কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে, যা সাধারণ অর্থনৈতিক বা গাণিতিক নিয়মের বাইরে।
বছরের পর বছর লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) না দেওয়া, টানা লোকসান, ঋণের পাহাড়ে ডুবে থাকা কিংবা উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ রকেটের গতিতে বাড়তে থাকে। ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয় এই তথাকথিত ‘জাঙ্ক শেয়ার’ বা ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার জন্য। কিন্তু এই কৃত্রিম জোয়ারের শেষ পরিণতি হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়।
কেন এমন হয় এবং কারা এর পেছনে কাজ করে?
মৌলভিত্তিহীন কোম্পানির শেয়ারের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো ব্যবসায়িক সাফল্য থাকে না, বরং কাজ করে কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও কারসাজিমূলক কৌশল।
কারসাজি চক্র বা গ্যাম্বলারদের দৌরাত্ম্য: এই খেলাটির মূল কারিগর হলো বড় পুঁজিপতি বা নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট, যাদের শেয়ারবাজারের ভাষায় ‘গ্যাম্বলার’ বলা হয়। কম দামি এবং উৎপাদনহীন কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা সাধারণত অনেক কম থাকে। চক্রটি প্রথমে গোপনে এই কোম্পানিগুলোর সিংহভাগ শেয়ার বাজার থেকে অল্প দামে কিনে নেয়। একে বলা হয় ‘শেয়ার কর্নার করা’। যখন বাজারে ওই শেয়ারের সরবরাহ কমে যায়, তখন তারা নিজেদের মধ্যে কৃত্রিমভাবে কেনাবেচা করে দাম বাড়াতে থাকে। দাম প্রতিদিন বাড়তে দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন এর পেছনে হয়তো কোনো বড় সুসংবাদ আছে।
গুজব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার: দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি মসৃণ করতে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপের সাহায্য নেওয়া হয়। “কোম্পানিটি নতুন করে উৎপাদনে যাচ্ছে”, “বিদেশি বড় বিনিয়োগ আসছে” কিংবা “মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে”—এমন সব মুখরোচক ও মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
‘ফোমো’ বা লোকসানের ভয়: সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন দেখেন একটি ৫ টাকার শেয়ার টানা কয়েকদিন বেড়ে ২০ টাকা হয়ে গেছে, তখন তাদের মধ্যে ‘FOMO’ (Fear of Missing Out) বা সুযোগ হারানোর ভয় কাজ করে। তারা ভাবেন, “আজ না কিনলে কাল হয়তো আরও লাভ হাতছাড়া হবে।” এই অন্ধ আবেগ থেকে তারা কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
এর চূড়ান্ত পরিণতি কী?
এই ধরনের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির পরিণতি সবসময়ই পূর্বনির্ধারিত এবং নির্মম। যখন শেয়ারের দাম চক্রটির টার্গেট অনুযায়ী আকাশচুম্বী পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তারা সাধারণ মানুষের চরম চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সব শেয়ার চড়া দামে বিক্রি করে দিয়ে বাজার থেকে বের হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘ডাম্পিং’।
চক্রটি বিদায় নেওয়ার পরপরই বাজারে ওই শেয়ারের কোনো ক্রেতা থাকে না। দাম তখন হু হু করে কমতে থাকে। প্রতিনিয়ত ‘লোয়ার সার্কিট’ (দাম কমার সর্বোচ্চ সীমা) স্পর্শ করায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চাইলেও তাদের শেয়ার বিক্রি করতে পারেন না। ফলে তাদের কষ্টার্জিত মূলধন চিরতরে আটকে যায় অথবা কাগজের টুকরোয় পরিণত হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির ব্যর্থতা কোথায়?
পুঁজিবাজারের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই ধরনের কারসাজি পুরোপুরি রোধ করতে না পারার পেছনে কিছু স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা লক্ষ্য করা যায়।
তদন্ত ও শাস্তির ধীরগতি: কোনো শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে বিএসইসি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু অধিকাংশ সময় তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখতে দেখতে বা শাস্তি নিশ্চিত হতে হতে কারসাজি চক্র শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব: অতীতে শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বড় অংশই নামমাত্র জরিমানা বা সতর্কবার্তার মাধ্যমে পার পেয়ে গেছে। অপরাধের তুলনায় শাস্তির পরিমাণ নগণ্য হওয়ায় চক্রগুলো বারবার একই অপরাধ করতে ভয় পায় না।
নজরদারির আধুনিকায়নে ঘাটতি: আধুনিক সফটওয়্যার বা সার্ভেল্যান্স সিস্টেমের মাধ্যমে কৃত্রিম লেনদেন বা একই অ্যাকাউন্টের মধ্যে বারবার কেনাবেচা (ইনসাইডার ট্রেডিং) তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বিএসইসির কার্যকারিতা এখনও শতভাগ প্রশ্নাতীত নয়।
নীতিমালার ধারাবাহিকতাহীনতা: প্রায়শই জেড ক্যাটাগরির শেয়ারের লেনদেনের নিয়ম বা মার্জিন ঋণের সুবিধা বারবার পরিবর্তন করা হয়। এই ধরনের নীতিগত অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেয় কারসাজি চক্র।
পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ করতে হলে শুধু ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং এই ধরনের পচা বা বন্ধ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে যারা জুয়া খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে বিএসইসিকে আরও কঠোর, দ্রুত এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
আপনার মতামত আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজারের এই ধরনের কারসাজি রোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?