Home অন্যান্য প্রথম চাকরি, প্রথম প্রেম আর সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলো

প্রথম চাকরি, প্রথম প্রেম আর সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলো

জীবনের রিপোর্টার

কামরুল ইসলাম: ভাঙা মন, নতুন চাকরি আর সাড়ে এগারোশত টাকার রাজকীয় জীবন অনাকাঙ্খিত এক ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে আকস্মিক নির্বাসন আর জীবনের প্রথম প্রেমিকার কোনো এক অজানা অভিমানে হঠাৎ হাত ছেড়ে চলে যাওয়া—দুই জোড়া আঘাত যখন প্রায় একই সময়ে বুকে এসে আছড়ে পড়েছিল, তখন চারপাশের চেনা পৃথিবীটা এক নিমেষেই ওলটপালট হয়ে যায়। বুকের ভেতর তখন কী এক ভয়ংকর শূন্যতা, কী এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আর অস্থিরতা! বেঁচে থাকার তাগিদে, কিংবা হয়তো সেই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে নিজেকে আড়াল করতেই তখন একটা চাকরির সন্ধান আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
ঠিক সেই মেঘাচ্ছন্ন সময়েই আমার জীবনে এক চিলতে রোদ্দুর হয়ে এসেছিল দৈনিক সংবাদ। ১৯৮১ সালের ১৭ ডিসেম্বর—পৌষের সেই কনকনে শীতের শুরুতে শিক্ষানবিস স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিলাম সেখানে। ছাত্রাবস্থায় এই পত্রিকারই বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলাম বলে মনের গহিনে একটা সুপ্ত ভালো লাগা আর প্রত্যাশা আগে থেকেই জমা ছিল।
ছয় মাসের শিক্ষানবিশকাল। মূল বেতন ৫৫০ টাকা, ৬০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ৩৩০ টাকা, আর সঙ্গে যাতায়াত ও চিকিৎসা ভাতা মিলিয়ে সর্বমোট সাড়ে এগারোশত টাকার একটি প্যাকেট। আজ হয়তো এই অঙ্কটা শুনলে অনেকেই হাসবেন, কিন্তু তখনকার দিনে এক তরুণ যুবকের রাজকীয় জীবনযাপনের জন্য এই টাকাই ছিল অঢেল। পকেটে টাকা, আর কাঁধে রিপোর্টারের পরিচয়—নিদারুণ এক ভালো লাগা আর অহংকারে দিনগুলো কাটতে লাগল। দুহাতে খরচ করতাম, আর নতুন পেশার প্রতিটি মুহূর্ত তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতাম।
শুরুর দিনগুলোতে অ্যাসাইনমেন্টের তালিকায় থাকত নানা সভা-সমাবেশ আর সংবাদ সম্মেলন। তখন দেশজুড়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গরম হাওয়া। একদিকে বিএনপির বিচারপতি আবদুস সাত্তার, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ড. কামাল হোসেন। প্রধান দুই দলের বাইরে ছিলেন বটগাছ প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মওলানা মোহাম্মদউল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম মহানায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী।
নির্বাচনী প্রচারণার সেই দিনগুলোর কথা আজও স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট ভাসে। বিচারপতি সাত্তারের পক্ষে ঢাকার তৎকালীন মেয়র ও পূর্তমন্ত্রী আবুল হাসনাত পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে প্রতিদিন শীতের সন্ধ্যার পর নির্বাচনী সভা করতেন। প্রায় প্রতিদিনই সেই সভাগুলো কাভার করার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপর। কুয়াশাঘেরা শীতের রাতে পুরান ঢাকার আলো-আঁধারি গলিতে সেই রাজনৈতিক উত্তাপের সাক্ষী হওয়া ছিল রোমাঞ্চকর।
স্মৃতির মণিকোঠায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে হাফেজ্জী হুজুরের সেই সংবাদ সম্মেলনের দৃশ্য। লালবাগ কেল্লার কাছে জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়ায় আমরা যখন অধীর আগ্রহে তাঁর বক্তব্য শুনছি, তখনই এক চিত্রসাংবাদিক ক্যামেরা তাক করতেই হুজুর ভীষণ রেগে গেলেন। হাত নেড়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন, “মমনু, মমনু!” অর্থাৎ ছবি তোলা যাবে না।
রাজনৈতিক সভা, কর্মী সভা কিংবা প্রেস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলন—যেখানেই যেতাম, আয়োজকদের খাতির-যত্নের কোনো কমতি থাকত না। তবে সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল অন্য সংবাদমাধ্যমের সমসাময়িক তরুণ রিপোর্টারদের সাথে পরিচয়। অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকে ফাঁকে চা-শিঙাড়ার আড্ডায় গড়ে ওঠা সেই জানাশোনা, বন্ধুত্ব আর হৃদ্যতা সময়ের সাথে সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। সেই দিনগুলোর মুগ্ধতা এত তীব্র ছিল যে, আজ জীবনের এই প্রান্তে এসেও মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে—যদি আরও একবার ফিরে যেতে পারতাম সেই সোনালী শিক্ষানবিসকালে!
তখনকার জাতীয় প্রেস ক্লাব ছিল এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। সদস্য ছাড়া ভেতরে ঢোকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোনো সিনিয়রের হাত ধরে যখন ভেতরে যেতাম, তখন দেশের দিকপাল সাংবাদিকদের দেখে সম্ভ্রমে চোখ জুড়িয়ে যেত। মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমিও এই ক্লাবের স্থায়ী অংশ হব। কিন্তু ভাগ্যিস, সেই স্বপ্ন আর সত্যি হয়নি। তিন তিনবার আবেদন করেও ব্যর্থ হতে হয়েছে। ‘সংবাদ’-এর সাংবাদিক পরিচয়টাই যেন ছিল এক অলিখিত অপরাধ; নাম দেখলেই তৎকালীন প্রভাবশালী এক বিশেষ গোষ্ঠীর সাংবাদিকরা ‘ব্ল্যাকবল’ দিয়ে আবেদন নাকচ করে দিতেন।
সেই না-পাওয়ার বেদনা অবশ্য আজ আর মনকে পীড়িত করে না। কারণ, পরবর্তীতে যখন স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে ফিরে এলাম, তখন যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও হারিয়ে যায়নি সেই সময়ের বন্ধনগুলো। ধুলো জমা স্মৃতির পাতা পেরিয়ে সেই দিনগুলোতে গড়ে ওঠা অনেক বন্ধুর সাথেই আজও নিয়মিত যোগাযোগ আছে, রয়ে গেছে সেই আদি ও অকৃত্রিম হৃদ্যতা। জীবনের প্রথম ঝোড়ো হাওয়া যাকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে চেয়েছিল, দৈনিক সংবাদের সেই সাড়ে এগারোশত টাকার চাকরি আর সাংবাদিকতার দিনগুলোই তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিল।