Home First Lead ফ্রেইট রেট ৮০% লাফ: অর্ডার বাতিলের শঙ্কায় পোশাক শিল্প

ফ্রেইট রেট ৮০% লাফ: অর্ডার বাতিলের শঙ্কায় পোশাক শিল্প

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বৈশ্বিক শিপিং বাণিজ্যে সাধারণত বছরের শেষভাগে যে ‘পিক সিজন’ (চাহিদার সর্বোচ্চ সময়) দেখা যায়, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে ২০২৬ সালে তা জুনের শুরুতেই চলে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আগামী জুলাই মাস থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন শুল্ক (Tariff) এড়ানোর তাগিদ এবং আসন্ন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে পশ্চিমা আমদানিকারকরা অনেক আগেভাগেই পণ্য বুকিং শুরু করেছেন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জাহাজের জায়গা (স্পেস) নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
শিপিং এজেন্ট নির্বাহিরা জানালেন, এই আগাম শিপমেন্টের চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে রুট পরিবর্তনের ধাক্কায় এশিয়ার প্রধান প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট হাবগুলোতে ভয়াবহ কনটেইনার ও জাহাজ জট সৃষ্টি হয়েছে। সিঙ্গাপুর, পোর্ট ক্লাং (মালয়েশিয়া) এবং হো চি মিন সিটির (ভিয়েতনাম) মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান হাবগুলোতে মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজগুলোর অপেক্ষার সময় অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে খালি কনটেইনারের (Equipment shortage) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক শিপিং খাতের এই নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা এখন সরাসরি আঘাত হানছে বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাতে।
লিড টাইম ও ট্রানজিট টাইমের মরণফাঁদ
তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার নির্বাহিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করা। কিন্তু চলমান সংকটে সেই ‘লিড টাইম’ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফিডার ভেসেলের মাধ্যমে পণ্য প্রথমে সিঙ্গাপুর বা পোর্ট ক্লাং-এর মতো এশীয় হাবগুলোতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে মাদার ভেসেলে করে পণ্য যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। বর্তমানে সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য প্রধান হাবে তীব্র জাহাজ জটের কারণে বাংলাদেশের পণ্যবাহী কনটেইনারগুলো দিনের পর দিন আটকা পড়ে থাকছে। ট্রানজিট টাইম স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমা ক্রেতাদের হাত পর্যন্ত সময়মতো পোশাক পৌঁছানো যাচ্ছে না। দ্রুত পরিবর্তনশীল ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ বা ট্রেন্ডি পোশাকের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব আমদানিকারকদের জন্য বড় লোকসান তৈরি করছে।
ফ্রেইট রেটের আকাশচুম্বী লাফ ও সারচার্জের বোঝা
শিপিং লাইনগুলো জাহাজের কৃত্রিম সংকট এবং দীর্ঘ রুটের অজুহাতে ফ্রেইট রেট (জাহাজ ভাড়া) কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার রুটে স্পট ফ্রেইট রেট রেকর্ড ৮০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে ইমার্জেন্সি ফুয়েল সারচার্জ, পিক সিজন সারচার্জ (PSS) এবং জেনারেল রেট ইনক্রিজ (GRI)।
চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপের রুটে কনটেইনার ভাড়া যেখানে স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াই হাজার ডলারের মধ্যে থাকার কথা, তা এখন প্রায় ৪ হাজার ডলার ছুঁইছুঁই করছে। আর আমেরিকার রুটে তা ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত, উৎপাদন ব্যাহত
সংকট কেবল পোশাক রপ্তানিতেই নয়, পোশাক তৈরির কাঁচামাল আমদানিতেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পোশাকের ওভেন ফেব্রিক্স, সুতা, বোতাম ও বিভিন্ন অ্যাকসেসরিজের জন্য ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। চীন-বাংলাদেশ রুটেও ফ্রেইট রেট কনটেইনার প্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে এবং খালি কনটেইনার সংকটের কারণে কাঁচামাল আসতে বিলম্ব হচ্ছে। দেশের ভেতরে লোডশেডিং এবং ডিজেল সংকটের কারণে এমনিতেই টেক্সটাইল মিলগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তার ওপর কাঁচামাল সময়মতো না আসায় পুরো উৎপাদন চক্র ধীর হয়ে পড়েছে।
এয়ার শিপমেন্টের চড়া মাশুল ও মুনাফা ধস
দেরিতে উৎপাদন এবং শিপিং জটের কারণে বায়ারদের বাতিল হওয়া এড়াতে অনেক রপ্তানিকারক বাধ্য হয়ে আকাশপথে বা ‘এয়ার শিপমেন্ট’ করে পণ্য পাঠাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইউরোপে এয়ার ফ্রেইট রেট এক লাফে প্রায় ৭০% বেড়ে প্রতি কেজিতে ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে জাহাজে নামমাত্র খরচে পণ্য পাঠানো যেত, সেখানে আকাশপথে কোটি কোটি টাকা বাড়তি মাসুল গুনতে হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, এয়ার শিপমেন্টের কারণে অর্ডারের পুরো মুনাফাতো যাচ্ছেই, উল্টো পকেট থেকে লোকসান দিতে হচ্ছে।
ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের শঙ্কা ও বাজার হারানোর ঝুঁকি
এই বহুমুখী সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এবং ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠছে। অনেক পশ্চিমা ক্রেতা আগামী মৌসুমের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮-১০% কাজের আদেশ (Work Order) কমিয়ে দেওয়ার আভাস দিয়েছেন। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এই শিপিং জট ও কনটেইনার সংকট আগামী কয়েক মাস স্থায়ী হলে বাংলাদেশের ওপরে থাকা অর্ডারগুলো মেক্সিকো, মরক্কো বা তুরস্কের মতো কাছাকাছি দূরত্বের দেশগুলোতে (Near-shoring) চলে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
অবস্থা বিবেচনায় পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং শিপিং বিশেষজ্ঞরা কলম্বো বা আঞ্চলিক বিকল্প রুটগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার তাগিদ দিচ্ছেন। একই সাথে চট্টগ্রাম বন্দরে দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং অফডক বা বেসরকারি ডিপো উন্মুখ রাখার জন্য সরকারের জরুরি নীতিনির্ধারণী সহায়তার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও তৈরি পোশাক খাতের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com