বয়স যে কেবলই একটা সংখ্যা, মাঠের সবুজ ক্যানভাসে আরও একবার তা প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি। চোট কাটিয়ে যখন অনেক ফুটবলার ছন্দ হাতড়ে বেড়ান, সেখানে এলএম১০ মাঠে ফিরলেন রাজকীয় ভঙ্গিতে, ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওলটপালট করে দিতে। হ্যামস্ট্রিংয়ের অস্বস্তির কারণে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে শুরুতে নামানোর ঝুঁকি নেননি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে তাঁর মাঠে প্রবেশ কেবল ম্যাচের দৃশ্যপটই বদলায়নি, ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘ ৬৮ বছরের এক অবিস্মরণীয় রেকর্ড।
কানসাস সিটির গ্যালারিতে তখন প্রায় ৮৮ হাজার ফুটবলপ্রেমীর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। ম্যাচের ৬৯তম মিনিটে যখন মেসি টাচলাইন পেরিয়ে মাঠে পা রাখলেন, গ্যালারির গর্জনই বলে দিচ্ছিল স্পটলাইট কার ওপর। মাঠে নামার ঠিক দুই মিনিটের মাথায় পেনাল্টি স্পট থেকে নেওয়া নিখুঁত শটে তিনি যখন প্রতিপক্ষের জাল কাঁপালেন, তখন ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেল এক নতুন অধ্যায়। ৩৮ বছর ১১ মাস ১৮ দিন বয়সে গোল করে আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ গোলদাতার রেকর্ড এখন মেসির দখলে।
এই কীর্তি গড়তে গিয়ে মেসি পেছনে ফেলেছেন কিংবদন্তি আনহেল আমাদেও লাব্রুনাকে। ১৯৫৭ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক রোকা কাপে যখন লাব্রুনা গোল করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৮ বছর ৯ মাস ১০ দিন। প্রায় সাত দশক ধরে কেউ যা ছূঁতে পারেনি, আধুনিক ফুটবলের এই জাদুকর তা অনায়াসেই নিজের করে নিলেন।
এই ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে মেসির ১৯৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এই গোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১১৭-তে, যা দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ৫৫ গোলের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। আর মাত্র একটি ম্যাচ, অর্থাৎ আসন্ন বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটিতে মাঠে নামলেই প্রথম আর্জেন্টাইন হিসেবে ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি।
রেকর্ডের খাতায় লাব্রুনার আরেকটি কীর্তি অবশ্য এখনও অক্ষত থাকছে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর ৮ মাস ১৬ দিন বয়সে মাঠে নেমে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সে খেলার রেকর্ডটি নিজের করে রেখেছিলেন লাব্রুনা, যা এই বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসির বয়স ৩৯ ছুঁলেও ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ২০১০ বিশ্বকাপে মার্টিন পালের্মোর গড়া বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করার রেকর্ডটি ভেঙে দেওয়ার দারুণ সুযোগ থাকছে বর্তমান অধিনায়কের সামনে।
মেসির এই রেকর্ডময় ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ ব্যবধানে সহজ জয় তুলে নিয়েছে। ম্যাচের ৮ম মিনিটেই তরুণ ডিফেন্ডার ভালেনতিন বার্কোর গোলে এগিয়ে যায় দল। আর ৮৫ মিনিটে মেসির চোখধাঁধানো এক আক্রমণ থেকে রদ্রিগো দে পলের সহায়তায় শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন থিয়াগো আলমাদা। এই দাপুটে জয়ের পর বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ড্রেসিংরুমের আত্মবিশ্বাস এখন আকাশচুম্বী। আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার মহাকাব্যিক মিশন।