বাংলাদেশ ভিক্ষা চায় না, সমতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চায়: আমিরুল হক
চিটাগাং চেম্বারে উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে মার্কিন দূতাবাস ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ যৌথভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বুধবার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারস্থ কনফারেন্স হলে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি (সিসিসিআই)-এর নেতৃবৃন্দের সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পল ফ্রস্ট (Mr. Paul Frost)-এর নেতৃত্বে এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের তবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও মতবিনিময় করা হয় সভায়।
মতবিনিময় সভায় মার্কিন কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পল ফ্রস্ট বলেন, আজকের এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ প্রসার করা এবং উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি টেকসই সংযোগ স্থাপন করা। একই সাথে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ও সুনির্দিষ্ট চাহিদাগুলো জানাও এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও ব্যবসা পদ্ধতি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে চান, তবে তারা আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (AmCham)-এর সাথে যৌথভাবে কাজ করতে পারেন। প
ল ফ্রস্ট আরও জানান, মার্কিন সরকার বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-র সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে তিনি সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করার উপযুক্ত সময় এখনই।
তিনি বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক রূপান্তরের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক করিডোর, এক্সপ্রেসওয়ে, এমআরটি (MRT), বন্দর উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত লাভজনক হবে।
চেম্বার সভাপতি বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধার কথা উল্লেখ করে মাতারবাড়ী ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর এবং চট্টগ্রামের বে-টার্মিনালের অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পগুলোতে মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি বর্তমান সরকার কর্তৃক চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘোষিত বিশেষ ‘ফ্রি-ট্রেড জোন’-এর সুবিধা উপভোগ করার জন্য কমার্শিয়াল কাউন্সেলরের মাধ্যমে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানান।
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, এই ফ্রি-ট্রেড জোনে বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা ছাড়াই মাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিরুল হক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বাংলাদেশ কারো কাছে ভিক্ষা চায় না, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চায়”। এক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন, যেখানে উভয় দেশই সমানভাবে লাভবান হবে।
মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি পলিটিক্যাল এন্ড ইকোনমিক কাউন্সেলর ডেভিড মু (Mr. David Moo) বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন এবং বিদ্যমান বাণিজ্যিক বাধাগুলো দূর করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক মার্কিন কোম্পানি সাফল্যের সাথে কাজ করছে এবং আরও অনেক কোম্পানি এখানে পণ্য বিক্রয় ও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে পারে, তবে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সংযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সভায় উপস্থিত অন্যান্য ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের উৎপাদনশীল খাতের প্রযুক্তি এবং ভারী মেশিনারীজ শিল্পে মার্কিন পণ্যের ব্যাপক সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সামিটে মার্কিন ব্যবসায়ীরা অংশ নিলে দুই দেশের বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে। নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় কৃষি খাত এবং সরকার ঘোষিত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় কটন ও ম্যানমেইড ফাইবার খাতে মার্কিন বিনিয়োগের অনুরোধ জানান। এর পাশাপাশি, চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে মার্কিন দূতাবাসের একটি কনস্যুলার অফিস স্থাপন, ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি বিমান ফ্লাইট চালু, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়েতে বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকগণের জন্য ভিসা ও পাসপোর্ট প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময় সভায় চিটাগাং চেম্বারের বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ, সিডিএ চেয়ারম্যান, উইম্যান চেম্বারের সভাপতি, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধি এবং চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।