Home বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞাপনের আড়ালে ফাঁদ: ঘটকালি সংস্থার প্রতারণা

বিজ্ঞাপনের আড়ালে ফাঁদ: ঘটকালি সংস্থার প্রতারণা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন গণমাধ্যমের পাতা খুললেই এখন চোখে পড়ে চটকদার সব বিজ্ঞাপন। “ডিভোর্সি/বিপত্নীক কিন্তু সুপ্রতিষ্ঠিত পাত্রের জন্য সাধারণ পাত্রী চাই”, “যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পাত্রীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পাত্র আবশ্যক” কিংবা “বিয়ের পর পাত্রকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হবে”—এমন সব আকর্ষণীয় অফার দিয়ে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করছে একশ্রেণির নামসর্বস্ব ঘটকালি সংস্থা বা তথাকথিত ‘ম্যারেজ মিডিয়া’। কিন্তু এই সব চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর সব প্রতারণার ফাঁদ। একটু অসচেতন হলেই এই ফাঁদে পা দিয়ে মানুষ হারাচ্ছেন লাখ লাখ টাকা, এমনকি শিকার হচ্ছেন ব্ল্যাকমেইলেরও।

অনুসন্ধানে এবং ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কয়েকটি ধাপে তাদের প্রতারণার জাল বিস্তার করে।
প্রথমত, মিথ্যা প্রলোভন ও ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করা হয়। প্রতারক চক্রগুলো সাধারণত এমন পাত্র বা পাত্রীর প্রোফাইল তৈরি করে যা যেকোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অত্যন্ত লোভনীয়। বিশেষ করে বিদেশযাত্রায় ইচ্ছুক তরুণদের টার্গেট করে ভুয়া প্রবাসী পাত্রী সাজানো হয়।
দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। শুরুতে নামমাত্র রেজিস্ট্রেশন ফি বা সদস্যপদ ফি নেওয়া হয়। এরপর পাত্র বা পাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করার কথা বলে, ভুয়া ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হয়।
পরবর্তীতে বায়োডাটা ম্যাচিং, দুই পরিবারের মিটিং আয়োজন, ভুয়া পাসপোর্ট-ভিসা প্রসেসিং কিংবা এনগেজমেন্টের খরচের কথা বলে দফায় দফায় বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, সাজানো পাত্র-পাত্রী ও ভুয়া বিয়ের আয়োজন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগের নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার কিছু চক্র আরও এক ধাপ এগিয়ে ভুয়া পাত্র-পাত্রী কিংবা ভাড়া করা অভিনেতা দিয়ে সামনাসামনি দেখাও করায়। এমনকি ভুয়া কাজী ও এফিডেভিট দিয়ে নকল বিয়ের আয়োজন করে টাকা-পয়সা ও গহনা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
চতুর্থত, সাইবার অপরাধ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পথ বেছে নেওয়া হয়। কিছু প্রতারক ম্যারেজ মিডিয়ার আড়ালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া আইডি খুলে ডিভোর্সি বা একক নারীদের টার্গেট করে। বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে গোপনে আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ধারণ করে পরবর্তীতে লাখ লাখ টাকা দাবি বা ব্ল্যাকমেইল করার নজিরও রয়েছে।
প্রতারণা থেকে বাঁচতে  সামাজিক ও অর্থনৈতিক এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে পাত্র-পাত্রী খোঁজার ক্ষেত্রে কিছু জরুরি সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। বিজ্ঞাপনের সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা পত্রিকায় শুধুমাত্র একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নাম বা স্থায়ী ঠিকানা না থাকা বিজ্ঞাপনগুলো থেকে দূরে থাকা উচিত।
প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা ও অফিস পরিদর্শন করতে হবে। কোনো ঘটকালি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে তাদের স্থায়ী অফিস পরিদর্শন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না তা যাচাই করে নিতে হবে।
অগ্রিম আর্থিক লেনদেনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পাত্র বা পাত্রীর পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে এবং উভয় পরিবারের মধ্যে সরাসরি আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত কোনো বড় অঙ্কের টাকা বা প্রসেসিং ফি দেওয়া যাবে না।
তথ্যাদি ও নথিপত্র ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাত্র বা পাত্রী পক্ষ যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা বা প্রবাসে থাকার দাবি করছে, তা নিজস্ব উদ্যোগে বিশ্বস্ত সোর্স বা নথিপত্র দেখে ভালোমতো ক্রস-চেক করে নিতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। বিয়ের কথা চললেও সম্পর্কের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা ভিডিও কলে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা স্পর্শকাতর ছবি ও তথ্য আদান-প্রদান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার করণীয়
এই ক্রমবর্ধমান সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, নিয়মিত নজরদারি ও সাইবার পেট্রোলিং বাড়াতে হবে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যেসব ম্যারেজ মিডিয়া সন্দেহজনক ও চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, তাদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ম্যারেজ মিডিয়া বা ঘটকালি ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নীতিমালা তৈরি করা উচিত। শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে যেন কেউ এই সংবেদনশীল ব্যবসা খুলে বসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, অনুমোদনহীন সংস্থার বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান চালাতে হবে। দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনুমোদনহীন ঘটকালি সংস্থাগুলোর অফিসে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা অভিযান পরিচালনা করে ভুয়া চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, দ্রুত আইনি প্রতিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করার পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা দণ্ডবিধির আওতায় দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জামিনে বের হয়ে তারা পুনরায় একই অপরাধে জড়াতে না পারে।
পঞ্চমত, ব্যাপক গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে গণমাধ্যমে তথ্যচিত্র বা সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে এই ধরণের প্রতারণার কৌশলগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।
বিয়ে একটি পবিত্র পারিবারিক বন্ধন। এই আবেগ ও সামাজিক চাহিদাকে পুঁজি করে যারা প্রতারণার বাণিজ্য চালাচ্ছে, তাদের রুখতে একদিকে যেমন নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রয়োজন আইনের কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগ।