আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রেল প্রযুক্তিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে প্রস্তুত জাপান। দেশটির সেন্ট্রাল জাপান রেলওয়ে কোম্পানি (JR Central) বর্তমানে তৈরি ও পরীক্ষা করছে বিশ্বের দ্রুততম ট্রেন ‘L0 Series’ (এল-জিরো সিরিজ)। ম্যাগনেটিক লেভিটেশন বা ‘ম্যাগলেভ’ (Maglev) প্রযুক্তিতে চালিত এই ট্রেনটি রেল চলাচলের সমস্ত পুরনো রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পথে।
গতির লড়াই: চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য
বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেনটি রয়েছে চীনে (সাংহাই ম্যাগলেভ), যার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টা প্রতি ৪৬০.২ কিলোমিটার। তবে জাপানের L0 সিরিজ পরীক্ষামূলকভাবে ইতিমধ্যে ৬০৩.৫ কিমি/ঘণ্টা গতি স্পর্শ করেছে, যা চীনের রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। ইউরোপের দ্রুততম ট্রেন যেমন—ফ্রান্সের TGV বা ইতালির AGV Italo-এর গতি সাধারণত ৩০৬-৩৫৪ কিমি/ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই তুলনায় জাপানের এই ট্রেনটি প্রায় দ্বিগুণ গতিতে ছুটতে সক্ষম।
ভ্রমণের সময় কমবে অভাবনীয়ভাবে
টোকিও থেকে নাগোয়া পর্যন্ত বর্তমানে বুলেট ট্রেনে (শিনকানসেন) যেতে সময় লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট থেকে ২.৫ ঘণ্টা। কিন্তু নতুন চুও-শিনকানসেন (Chuo-Shinkansen) লাইনে এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট। পরবর্তীতে এই লাইন ওসাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হলে টোকিও থেকে ওসাকা পৌঁছানো যাবে মাত্র ১ ঘণ্টায়, যা বর্তমানে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় নেয়।
প্রযুক্তির জাদু: চাকা ছাড়াই উড়বে ট্রেন
ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে ট্রেনটি লাইনের ওপর সরাসরি স্পর্শ না করে শক্তিশালী চৌম্বকীয় শক্তির সাহায্যে শূন্যে ভেসে থাকে। ঘর্ষণহীন এই পদ্ধতিতে ট্রেনটি বাতাসের ওপর দিয়ে সগৌরবে গ্লাইড করে এগিয়ে যায়। এই স্বপ্নীল প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯.৯ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৫২ বিলিয়ন পাউন্ড)।
প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান সময়সীমা
প্রথমে ২০২৭ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সুড়ঙ্গ খনন এবং পরিবেশগত নানা জটিলতায় এটি প্রায় আট বছর পিছিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, এই অত্যাধুনিক ট্রেনটি যাত্রী পরিবহনের জন্য ২০৩৪ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউরোপে কি এই প্রযুক্তি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ বা যুক্তরাজ্যের বাজারে এই ট্রেন চালুর পথে বেশ কিছু বাধা রয়েছে:
বিশাল খরচ ও অবকাঠামো: এটি বিদ্যমান কোনো রেললাইনে চলতে পারবে না, এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন ট্র্যাক এবং সুড়ঙ্গ প্রয়োজন।
ভ্রমণ অভিজ্ঞতা: ইউরোপীয় যাত্রীরা গতির চেয়েও আরামদায়ক ভ্রমণ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ধারণক্ষমতা ও ব্যয়: এই ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা সাধারণ ট্রেনের তুলনায় কম এবং এটি প্রচুর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নয়, ফলে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়া কঠিন।
জাপানের এই উদ্ভাবন কেবল একটি ট্রেন নয়, বরং গতির দুনিয়ায় এক নতুন বিপ্লবের নাম। এখন দেখার বিষয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি বিশ্ব যাতায়াত ব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।
এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










