Home Second Lead বিপিসির কচ্ছপ গতি, বেসরকারি খাতের একচেটিয়া দৌড়: এলপিজি সংকটের আসল কারিগর কে?

বিপিসির কচ্ছপ গতি, বেসরকারি খাতের একচেটিয়া দৌড়: এলপিজি সংকটের আসল কারিগর কে?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম:  জ্বালানি খাতে এলপিজি (LPG) এখন আর বিলাসিতা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই অতিপ্রয়োজনীয় খাতের নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের হাতে নেই। তথ্য বলছে, বাজারের ৯৮ শতাংশ এখন বেসরকারি সিন্ডিকেটের কবজায়, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি মাত্র ২ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে।
গত ১৫ দিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কেবল ‘দুর্নীতি’ নয়, বরং একটি ‘পরিকল্পিত বাজার দখলের’ রাজনীতি।
সক্ষমতার সংকটে বিপিসি: কেন এই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা?
বিপিসির সক্ষমতা বৃদ্ধি না করার পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যখন বেসরকারি কোম্পানিগুলো একের পর এক নতুন বটলিং প্ল্যান্ট করছে, তখন সরকারি পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পগুলো শ্লথ গতিতে চলছে। বিপিসির এই নিষ্ক্রিয়তাই বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ‘প্রাইস মেকার’ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে বিইআরসি (BERC) দাম নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
 বটলিং প্ল্যান্ট থেকে খুচরা বিক্রেতা: চেইনের প্রতিটি স্তরেই কারসাজি

আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সিন্ডিকেট কেবল একক কোনো কোম্পানি পরিচালনা করছে না। এটি একটি ‘ভার্টিক্যাল সিন্ডিকেট’:

বটলিং পর্যায়: তারা চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয় (Artificial Scarcity)।
পরিবেশক পর্যায়: ডিলাররা সিলিন্ডার মজুত করে দাম বাড়ার অপেক্ষায় থাকে।
খুচরা পর্যায়: বিক্রেতারা ‘সাপ্লাই নেই’ অজুহাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০-৪০০ টাকা বেশি আদায় করে।

 গত ১৫ দিনের গণ-লুণ্ঠন: বিশ্লেষণের তথ্যচিত্র

বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে সিলিন্ডার প্রতি গড় অতিরিক্ত আদায় হয়েছে ৩০০ টাকা। প্রতিদিন যদি দেশে গড়ে ১ লাখ সিলিন্ডারও বিক্রি হয় (বেসরকারি হিসেবে), তবে গত ১৫ দিনে সিন্ডিকেটটি কেবল অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবেই ৪৫০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। অথচ আমদানিকারকদের এলসি (LC) বা বিশ্ববাজারের মূল্যে এমন কোনো পরিবর্তন হয়নি যা এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে সমর্থন করে।

সমাধান কেবল মোবাইল কোর্টে নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার

বাজার পর্যবেক্ষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল খুচরা দোকানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এই মহামারি থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন:

কোটা পদ্ধতি: বিপিসির বাজার অংশীদারিত্ব অন্তত ৩০ শতাংশে উন্নীত করা।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং: প্রতিটি সিলিন্ডার বটলিং প্ল্যান্ট থেকে ক্রেতা পর্যন্ত কত দামে পৌঁছাচ্ছে, তা কিউআর কোড বা ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা।
বটলিং প্ল্যান্টে অভিযান: খুচরা দোকানে না গিয়ে সরাসরি বড় বড় কোম্পানির ডিপো এবং ডিলারদের গুদামে তল্লাশি চালানো।

ভোক্তার হাহাকার: “আমরা কি তবে জিম্মি?”

বাজারে এলপিজি কিনতে আসা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরম পর্যায়ে।  বহদ্দারহাট এলাকায় সিলিন্ডার কিনতে আসা সরকারি চাকরিজীবী মাহমুদুল হাসান বলেন:

“সরকার দাম ঠিক করে দেয় কাগজে-কলমে, কিন্তু দোকানে গেলে সেটা উধাও। দোকানদার বলে সাপ্লাই নেই। আমাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। আমরা কি তবে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি?”

একই চিত্র দেখা গেছে গৃহিণী সাজেদা বেগমের কথায়:

“প্রতি মাসেই এলপিজির দাম বাড়ে, কিন্তু কমার কোনো লক্ষণ নেই। পাইপলাইনের গ্যাস নেই বলে আমরা এলপিজি ব্যবহার করি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মাটির চুলায় ফিরে যেতে হবে। কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়ায়, আর আমাদের পকেট ফাঁকা হয়।”

 বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণহীনতার পরিণাম:  জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে  এই সংকটের মূলে সরকারের উদাসীনতা। তাদের মতে,

“বিপিসিকে (BPC) বসিয়ে রেখে বেসরকারি খাতকে ৯৮ শতাংশ বাজার ছেড়ে দেওয়া একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল। যখন কোনো খাতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বেসরকারি হাতে চলে যায়, তখন তারা জনকল্যাণের চেয়ে মুনাফাকেই বড় করে দেখে। বিইআরসি (BERC) শুধু দাম ঘোষণা করে দায় সারলে হবে না, সেই দাম কার্যকর হচ্ছে কি না তা তদারকি করার জন্য কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিপিসির বাজার হিস্যা অন্তত ২০-৩০ শতাংশ না হলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা অসম্ভব।”

অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকতের মতে, “এলপিজি এখন আর বিলাসদ্রব্য নয়, এটি মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি। এখানে ‘অলিগোপলি’ (অল্প কয়েকজনের বাজার দখল) তৈরি হয়েছে। আমদানিকারক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তথ্য আদান-প্রদান স্বচ্ছ করতে হবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ছাড়া এই অদৃশ্য সিন্ডিকেটকে ধরা সম্ভব নয়।”

রাষ্ট্রকে কেবল দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না, অভিভাবকের ভূমিকা নিতে হবে। একদিকে বিপিসিকে আধুনিকায়ন করে বাজার হিস্যা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে লুণ্ঠনকারী কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। নতুবা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রাজপথে আছড়ে পড়লে তার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।