লোহিত সাগর আর বাব এল-মান্দেব প্রণালীর সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো মেলেনি। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য পরিবহনে যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিল, তা এখন বেশ গভীর রূপ নিয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে সুয়েজ খালের সংক্ষিপ্ত পথ ছেড়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাচ্ছে। এর সরাসরি ধাক্কা এসে পড়েছে এশিয়ার বড় বড় রপ্তানিকারক বন্দরগুলোতে। একদিকে খালি কনটেইনারের চরম কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়ায় চলছে টানা অস্থিরতা।
আফ্রিকার নিচ দিয়ে ঘুরে যাওয়ার কারণে একেকটি জাহাজের গন্তব্যে পৌঁছাতে আগের চেয়ে অন্তত ১০ থেকে ১৪ দিন সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। এতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ছন্দ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এশিয়া থেকে মালামাল নিয়ে ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় যাওয়া কনটেইনারগুলো যে সময়ে খালি হয়ে ফেরত আসার কথা, জাহাজগুলো বাড়তি সময় সাগরে আটকে থাকায় তা সময়মতো ফিরতে পারছে না। যে কনটেইনারগুলো সাধারণত এক-দেড় মাসের মাথায় নতুন পণ্য তোলার জন্য বন্দরে থাকার কথা, সেগুলো এখন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পথেই আটকে থাকছে।
ফলে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রধান উৎপাদন ও রপ্তানিকেন্দ্রগুলোতে খালি কনটেইনারের হাহাকার দেখা দিয়েছে। অনেক বন্দরে সময়মতো কনটেইনার না পেয়ে গুদামেই পড়ে থাকছে কোটি কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্য, যার কারণে ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত লোকসান ও জরিমানা।
এই সংকটের সুযোগ নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোও পিক সিজন সারচার্জ ও নানা ধরনের হ্যান্ডলিং ফির নামে বাড়তি টাকা আদায় করছে। নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ায় সাংহাই, নিংবো কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো ব্যস্ততম ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে জাহাজের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। সময় বাঁচাতে গিয়ে অনেক বড় বড় জাহাজ ছোট ছোট বন্দরগুলোকে এড়িয়ে সরাসরি বড় হাবগুলোতে ভিড়ছে।
এতে আঞ্চলিক ছোট বন্দরগুলোর সাথে মূল রুটের যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং কনটেইনারের জট আরও জটিল হচ্ছে।
কনটেইনারের টানাটানি এবং বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপে আন্তর্জাতিক ফ্রেইট রেট এক লাফে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। এশিয়া থেকে উত্তর ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে ৪০ ফুটের একেকটি কনটেইনার পাঠানোর খরচ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে অস্বাভাবিক পর্যায়ে ঠেকেছে। একই অবস্থা দাঁড়িয়েছে এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলের রুটগুলোতেও।
স্পট মার্কেটে কনটেইনারের জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যাওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোমতে সামলে নিলেও সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুয়েজ খালের পথ পুরোপুরি স্বাভাবিক ও নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার এই সংকট সহজে মেটার সম্ভাবনা কম। শিপিং কোম্পানিগুলো বাজারে নতুন নতুন কনটেইনার নামালেও সমুদ্রের বাড়তি দূরত্ব ও সময় সেই পুরো সক্ষমতাকেই যেন গিলে খাচ্ছে। কাঁচামাল ও তৈরি পণ্যের পরিবহন খরচ যেভাবে বাড়ছে, তার শেষ প্রভাব গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিপিং ও বৈশ্বিক লজিস্টিকসের নিয়মিত খবরের জন্য businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মতামত মন্তব্যে জানান।