বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, বান্দরবান: পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদীর কলতান আর সবুজের মিতালীর মাঝে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের হাত ধরে বেঁচে রয়েছে এক শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য—কোমর তাঁত। স্থানীয় ভাষায় যা ‘বাইন’ বা ‘কোমর তাঁত’ নামে পরিচিত। শত বছর ধরে নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র তৈরির এই ঘরোয়া মাধ্যমটি এখন আর কেবল পাহাড়ের গণ্ডির ভেতর সীমাবদ্ধ নেই।
নান্দনিক বুনন, নজরকাড়া নকশা আর শতভাগ সুতি সুতার আরামদায়ক ও টেকসই বৈশিষ্ট্যের কারণে বান্দরবানের মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা, ম্রো ও বম সম্প্রদায়ের তৈরি এই কাপড়ের চাহিদা এখন দেশজুড়ে তুঙ্গে।
পাহাড়ি ক্যানভাসে সুতোর কারুকাজ
কোমর তাঁতের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এর জন্য কোনো যান্ত্রিক বা ভারী কাঠামোর প্রয়োজন হয় না। বাঁশ, কাঠ আর রশি দিয়ে তৈরি একটি সাধারণ ফ্রেম কোমরের সাথে বেঁধে মাটিতে বসেই এই কাপড় বোনেন পাহাড়ি নারীরা। একসময় জুমের তুলা থেকে নিজেদের তৈরি সুতা এবং প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হলেও, এখন বাজার থেকে মানসম্মত সুতা সংগ্রহ করে তাতে বৈচিত্র্যময় রঙ ও নকশার সংযোজন করা হচ্ছে।
মারমাদের ‘থামি’ (ঐতিহ্যবাহী স্কার্ট) থেকে শুরু করে চাদর, মাফলার, ওড়না, ফতুয়া, ব্যাগ এবং গৃহস্থালির নানা শৌখিন সামগ্রী তৈরি হচ্ছে এই তাঁতে। একেকটি পোশাক বা চাদর বুনতে সময় লাগে তিন থেকে সাত দিন। আর এই প্রতিটি সুতোর ভাঁজে লুকিয়ে থাকে একেকজন পাহাড়ি নারীর ধৈর্য ও শৈল্পিক মনন।
সমতল ও আধুনিক ফ্যাশনে কোমর তাঁত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমতলের ফ্যাশন সচেতন মানুষের কাছে এই কোমর তাঁতের কাপড়ের গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশেষ করে শীতের চাদর, গরমের আরামদায়ক ফতুয়া বা থ্রি-পিসের জন্য শহুরে তরুণ-তরুণীরা ঝুঁকছেন এই দিকে। দেশীয় অনেক বড় ফ্যাশন হাউস এখন বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাড়াগুলো থেকে সরাসরি কাপড় সংগ্রহ করছে।
অনলাইনের কল্যাণে তরুণ উদ্যোক্তারাও এই পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ফলে ঘরের কোণে বসে নিজের ও পরিবারের জন্য কাপড় বোনার এই আদি শিল্পটি এখন রূপ নিয়েছে একটি লাভজনক কুটির শিল্পে।
মূলধন সংকট ও টেকসই প্রসারের দাবি
চাহিদা বাড়লেও এই শিল্পের পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজির অভাব। বান্দরবান সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি কিংবা থানচির দুর্গম পাড়ার বেশিরভাগ তাঁতশিল্পী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার নিজস্ব বড় মূলধন নেই। সুতা ও রঙের দাম প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় অনেক সময় অর্ডারের বিপরীতে পর্যাপ্ত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় না।
স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর পরিধি আরও বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সাথে দুর্গম অঞ্চলের প্রান্তিক নারীদের আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও ই-কমার্সের আওতায় আনতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং পাহাড়ি নারীরা তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য পাবেন। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কোমর তাঁতের এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনামের সাথে স্থান করে নিতে পারে।