কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় ভারতের ‘চা বলয়’ হিসেবে পরিচিত আসাম ও দার্জিলিংয়ের বাগানগুলোতে হাহাকার শুরু হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে এবার ফার্স্ট ফ্লাশ বা বসন্তকালীন চায়ের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা এই অঞ্চলের চা শিল্পের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ জোগান দিয়ে থাকে।
দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির সংকট
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া টানা খরা ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বিরাজ করেছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার শীতকালে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৯৫-৯৮ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
দীর্ঘ চার মাস বৃষ্টির দেখা না পাওয়ায় চা গাছগুলোতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা কমে গেছে, যার ফলে ফার্স্ট ফ্লাশের জন্য প্রয়োজনীয় কচি কুঁড়ি (Buds) গজাতে অনেক দেরি হয়েছে।
দার্জিলিংয়ের গুণগত মান ও উৎপাদনের ধস
দার্জিলিংয়ের ৮৭টি বাগানে উৎপাদিত চায়ের খ্যাতি তার বিশেষ সুগন্ধের জন্য। কিন্তু তাপমাত্রা ৩২-৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যাওয়ায় এবং শীতকালীন বৃষ্টির অভাবে চায়ের সেই চিরাচরিত ‘মাসকটেল’ ফ্লেভার বা সুগন্ধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
টি বোর্ড অব ইন্ডিয়ার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, আশির দশকে যেখানে বার্ষিক উৎপাদন ছিল ১৪ মিলিয়ন কেজি, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫.২৫ মিলিয়ন কেজিতে। ২০২৬ সালের এই বসন্তকালীন খরা সেই সংখ্যাকে আরও নিচে নামিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
আসামে পোকার আক্রমণ ও রোদের তীব্রতা
আসামের ডিব্রুগড়, যোরহাট এবং তিনসুকিয়ার বাগানগুলোতে তাপমাত্রা এখন প্রায় ৪০-৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাচ্ছে। অত্যাধিক গরম এবং আর্দ্রতার অভাবে রেড স্পাইডার মাইট-সহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণ বেড়ে গেছে। অনেক বাগানে কচি পাতা কালো হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে, যা চায়ের লিকারের কড়া স্বাদ বা ‘বডি’ নষ্ট করে দিচ্ছে।
উৎপাদন খরচ ও নিলাম বাজারে প্রভাব
বৃষ্টির অভাবে বাগান মালিকদের কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফার্স্ট ফ্লাশের চায়ের সরবরাহ কম থাকায় আন্তর্জাতিক নিলামে এর দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, গুণগত মান ঠিক না থাকায় বিশ্ববাজারের বড় ক্রেতারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় এখন ‘ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট’ বা জলবায়ু সহনশীল চারা রোপণ এবং উন্নত সেচ অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম দামী এই পানীয় অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
চায়ের বাজার ও উৎপাদন বিষয়ক আরও আপডেট পেতে businesstoday24.com অনুসরণ করুন।