Home First Lead ফেরিঘাটে কার অবহেলায় এই মৃত্যু? কাগজে-কলমে নিয়ম, বাস্তবে লাশের মিছিল

ফেরিঘাটে কার অবহেলায় এই মৃত্যু? কাগজে-কলমে নিয়ম, বাস্তবে লাশের মিছিল

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, রাজবাড়ি: ফেরি পারাপারের সময় বাস থেকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার নিয়মটি বহু পুরনো। বিআইডব্লিউটিসি এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, পন্টুনে ওঠার আগেই বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দিতে হবে এবং বাসটি খালি অবস্থায় ফেরিতে উঠবে। কিন্তু গত বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া ঘাটে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ ডুবির ঘটনা দেখিয়ে দিল, এই নিয়ম এখন কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ।
দুর্ঘটনা নাকি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড?
বিকেল সোয়া ৫টার দিকে যখন সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়, তখন বাসের ভেতরে ছিল অর্ধশতাধিক যাত্রী। যদি নিয়ম মেনে যাত্রীদের আগেই নামিয়ে দেওয়া হতো, তবে বাসটি ডুবলেও হয়তো ১৭টি প্রাণ অকালে ঝরে যেত না।
প্রাথমিক তদন্তে যেসব গাফিলতি উঠে আসছে:
  • চালকের বেপরোয়া মনোভাব: ফেরিতে ওঠার সময় বাসের গতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা চালকের দায়িত্ব। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসটি পন্টুনে থাকা অবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে নদীতে পড়ে যায়।
  • ঘাট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা: পন্টুনে দায়িত্বরত কর্মীদের কাজ হলো নিশ্চিত করা যে কোনো বাস যাত্রী নিয়ে ফেরিতে উঠছে কি না। নিয়মের তোয়াক্কা না করে যাত্রীসহ বাসকে কেন পন্টুনে ঢুকতে দেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
  • তদারকির অভাব: মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট বা কড়াকড়ি দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো নজরদারি নেই। ফলে চালক ও হেলপাররা সময় বাঁচাতে যাত্রীদের নামানোর ঝামেলায় যেতে চান না।
কান্নায় ভারী পদ্মার পাড়
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ রাত ১২টার পর যখন বাসটি টেনে তোলে, তখন একের পর এক মরদেহ বের হয়ে আসছিল। রেহেনা বেগম বা মর্জিনা বেগমের মতো সাধারণ যাত্রীরা জানতেনও না যে নিয়ম ভঙ্গের এই মাশুল তাদের জীবন দিয়ে দিতে হবে। চিকিৎসক নুসরাত চিকিৎসাধীন থাকলেও তার মানসিক ট্রমা হয়তো সারাজীবনের।
দায়ী আসলে কারা?
এই প্রাণহানির দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালেই থেকে যাবে। ১. বাস কর্তৃপক্ষ: যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে কেন তারা নিয়ম ভাঙল? ২. বিআইডব্লিউটিসি: ঘাটে নিয়মের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের। তারা কেন নির্বিকার ছিল? ৩. যাত্রী সাধারণ: অনেক সময় যাত্রীরাও অলসতা করে বাস থেকে নামতে চান না, যা পরোক্ষভাবে ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশে নৌ-দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবেদন জমা পড়ে, কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ দৌলতদিয়া বা পাটুরিয়ার মতো ঘাটগুলো একেকটি মরণফাঁদ হয়েই থাকবে।