বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা—যেখানে দেশি-বিদেশি ফ্রেইট রেটের ওঠানামায় থমকে দাঁড়ায় অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি, সেখানে ঘাটের মাশুল যদি বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে দাঁড়ায়, তবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কতটুকু সম্ভব?
ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর এড়িয়ে সুয়েজ ক্যানালের পরিবর্তে ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে ঘুরতি পথে চলছে জাহাজগুলো। দীর্ঘ যাত্রাপথ, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, কর্মীদের বর্ধিত ভাতা আর চড়া বিমা প্রিমিয়ামে এমনিতেই হাঁসফাঁস অবস্থা আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের। কার্যক্ষম জাহাজ সংকটে বিশ্বব্যাপী ফ্রেইট রেট যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ফটক চট্টগ্রাম বন্দরে স্থানীয় ট্যারিফ ও মাশুলের বাড়তি চাপ যেন আগুনে ঘি ঢালছে।
বিশ্ববাজারের ঝাপটা আমরা হয়তো থামাতে পারব না, কিন্তু নিজেদের বন্দরে অযৌক্তিক খরচের যে শিকল তৈরি হয়ে আছে, তা কাটার চাবিকাঠি তো আমাদের হাতেই—এমনই ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা জানান শিপিং খাতের উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ)-এর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এমনিতেই প্রতিটি চালানে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তার ওপর চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান চার্জ ও মাশুল কাঠামোর কারণে বিদেশি শিপিং লাইনগুলোর কাছে বাংলাদেশ একটি ব্যয়বহুল গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, “আমরা বন্দরের আধুনিকায়ন বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিরোধী নই। তবে ট্যারিফ নির্ধারণে একটি যৌক্তিক এবং প্রতিযোগিতামূলক নীতি থাকা জরুরি। লোহিত সাগর সংকটের কারণে বৈশ্বিক লজিস্টিকসে যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু বন্দরের অনাবশ্যক চার্জ কমানো, অপেক্ষমাণ সময় হ্রাস করা এবং কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাইজেশন করা আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। স্থানীয়ভাবে এই খরচগুলো কমানো না গেলে সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগী সক্ষমতা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যের ল্যান্ডিং চার্জ, স্টোর রেন্ট, ডেমারেজ ও অন্যান্য সেবাভিত্তিক মাশুলের যে বর্তমান কাঠামো, তা আঞ্চলিক অন্যান্য সমুদ্রবন্দরের তুলনায় অসংগতিপূর্ণ। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে ট্যারিফ কাঠামো যৌক্তিকীকরণের অনুরোধ করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন না ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি কেবল শিপিং এজেন্ট বা জাহাজ মালিকদের লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাব সহজ: ঘাটে যখন চার্জ বাড়ে, তখন শিপিং লাইন সেই বাড়তি টাকা পকেট থেকে দেয় না। তারা সেই খরচ যোগ করে দেয় পণ্যের ভাড়ায় বা ফ্রেইট চার্জে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানিকারকদের ‘ল্যান্ডেড কস্ট’-এর ওপর।
শিল্পের জন্য আনা কাঁচামাল কিংবা মূলধনি যন্ত্রপাতির উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ে, তেমনি বেড়ে যায় জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম। কারখানার মালিক অতিরিক্ত এই উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে বাধ্য হন পণ্যের পাইকারি ও খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে। দিনশেষে এই চড়া খরচের মূল বোঝাটা গিয়ে চাপে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোক্তার ঘাড়ে। পণ্যের প্রতিটি চালানের পেছনের অদৃশ্য ‘প্যারালাল কস্ট’ কীভাবে মূল্যস্ফীতির পারদ চড়াচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই শুল্ক অসংগতি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
আবার উল্টো পিঠে, দেশের রপ্তানি বাণিজ্যও মুখোমুখি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জের। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা বিশ্ববাজারে যখন প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে দরদাম করে টিকে থাকার লড়াই করছেন, তখন মাশুলের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হাতছাড়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্ডার।
বিশ্লেষকদের মতে, বন্দর কেবল রাজস্ব উপার্জনের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান হতে পারে না; একে জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে হবে।বিশ্বজুড়ে লজিস্টিকস ফ্রন্টে যে পরিবর্তন আসছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে বন্দর ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের কার্যকর সংলাপ এখন সময়ের দাবি।