বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথিতযশা করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কার্যদিবসেই দেশের পুঁজিবাজারে এক নজিরবিহীন আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে তাঁর সাবেক কর্মস্থল ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করেছে।
আজ রবিবার লেনদেনের শুরুতেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সবচেয়ে বেশি নজর ছিল নবনিযুক্ত বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেগুলোর ওপর।
ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি: লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১০% বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭.২ টাকায় পৌঁছায় এবং বিক্রেতা সংকটের কারণে লেনদেন হল্ট (স্থগিত) হয়ে যায়। মাসুদ খান এই গ্রুপে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও বোর্ডের চিফ অ্যাডভাইজার হিসেবে দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট: ক্রাউন সিমেন্টের স্পন্সরদের সাথে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব থাকা এই কোম্পানিটির শেয়ারের দামও এক লাফে ১০% বেড়ে ৫১.৭ টাকায় উন্নীত হয় এবং হল্টেড হয়।
ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার: তিনি যেখানে চেয়ারম্যান ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত ছিলেন, সেই বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারের দরও ৩.১৩% বৃদ্ধি পেয়ে ২,১৩২ টাকায় স্থিতি পায়।
কেন বিনিয়োগকারীরা এই শেয়ারগুলোতে ঝুঁকছেন?
কোনো কোম্পানির তাৎক্ষণিক আর্থিক পারফরম্যান্স বা লভ্যাংশ ঘোষণার পরিবর্তন ছাড়াই কেবল একজন ব্যক্তির পদবি পরিবর্তনের কারণে শেয়ারের এই গণ-ক্রয়ের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ বিজন চক্রবর্তী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আমাদের দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি মজ্জাগত মনস্তাত্ত্বিক ধারণা রয়েছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান যে করপোরেট গ্রুপ থেকে আসছেন, সেই গ্রুপ বা খাতটি আগামী দিনে এক ধরনের অদৃশ্য ‘নীতিগত সুরক্ষা’ বা বাড়তি কমপ্লায়েন্স সুবিধা পাবে। এই কাল্পনিক নিরাপত্তার ওপর ভর করেই ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। আরও একটি বিষয় রয়েছে এ ক্ষেত্রে। বাজারের একশ্রেণীর বড় ও চতুর কারবারি (Speculators) এই ধরনের বড় খবরকে পুঁজি করে হাইপ বা কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করার জন্য শুরুতেই বড় ভলিউমে শেয়ার কিনে দাম বাড়িয়ে দেয়, যা দেখে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে পড়ার ভয়ে (FOMO) যেকোনো মূল্যে সেই শেয়ার কিনতে প্ররোচিত হয়।
কয়েকজন অর্থনৈতিক প্রতিবেদকের সাথে কথা বললে তারা সরাসরি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে—বিএসইসি চেয়ারম্যানের পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্টতার সাথে ওইসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়া বা কমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি সম্পর্ক নেই। আইন অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির সাথে সাথেই মাসুদ খানকে তাঁর পূর্বের সমস্ত পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুষঙ্গ (যেমন ক্রাউন সিমেন্ট বা ইউনিলিভারের পদ) সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে হয়েছে। তাছাড়া, বিএসইসি একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার কাজ সামগ্রিক বাজারের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা; কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ব্যবসায়িক মুনাফা বাড়িয়ে দেওয়া বা শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা নয়।
রবিবার যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে তা সম্পূর্ণ সাময়িক এবং মনস্তাত্ত্বিক। কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ (Cost), বিক্রয় ভলিউম (Volume) কিংবা ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতার (DVCR – Dividend Volume Cost Ratio) সাথে এই নিয়োগের সরাসরি কোনো আর্থিক সংযোগ নেই। চেয়ারম্যানের পূর্ব পরিচয়ের কারণে কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে কোনো অন্যায্য সুবিধা পাবে না, ঠিক তেমনি বাজারে কোনো পতন হলে নিয়ন্ত্রক প্রধানের কারণে সেই শেয়ারের পতন ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব নয়।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ‘পারসোনালিটি-ড্রাইভেন’ বা ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হাইপের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতেও দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নতুন কেউ এলে তাঁর সংশ্লিষ্ট খাতের শেয়ার নিয়ে সাময়িক ফাটকা খেলা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পরই যখন বাজার আবার স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী আচরণ শুরু করে, তখন এই কৃত্রিমভাবে বেড়ে যাওয়া শেয়ারগুলোর দাম দ্রুত কমতে থাকে। ফলস্বরূপ, যারা সর্বোচ্চ দামে শেয়ারগুলো কেনেন, সেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই দীর্ঘমেয়াদে পুঁজি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিনিয়োগকারীদের উচিত আবেগের বশে না ভেসে, কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি (Fundamentals), আর্থিক প্রতিবেদন এবং দীর্ঘমেয়াদি ডিভিডেন্ড ট্র্যাক রেকর্ড দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া।