বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ: কথায় বলে, অবলা প্রাণীর কষ্টের কোনো ভাষা থাকে না; তাদের যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে বোবা চাহনিতে। তেমনই এক নির্মম ও বুকভাঙা বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার স্বরূপপুর ইউনিয়নের গোকুলনগর গ্রাম। টানা ছয়টি মাস যেখানে মানুষের এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব, সেখানে বুকসমান কাদাপানির নরকে অনবরত বাঁধা ছিল চারটি নিরীহ মহিষ। কাদার ভেতরেই তাদের দাঁড়িয়ে থাকা, কাদার মধ্যেই অনাহারে-অর্ধাহারে খাওয়া, আর চরম ক্লান্তিতে সেই নোংরা কাদাতেই মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়া। অবশেষে দীর্ঘ ১৮০ দিনের সেই অবর্ণনীয় নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে অবলা প্রাণীগুলো।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোকুলনগর গ্রামের মৃত ফরজ আলীর ছেলে আব্দুল আলিম তার এই চারটি মহিষকে প্রায় ছয় মাস ধরে বাড়ির পাশে বুকসমান কাদার মধ্যে সারাক্ষণ বেঁধে রেখেছিলেন। রোগ-জীবাণু আর নোংরা কাদায় ডুবে থেকে প্রাণীগুলোর শরীর যেমন নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল, তেমনি তাদের চোখেমুখে জমেছিল দীর্ঘদিনের হাহাকার।
অবশেষে এই নির্বাক আর্তনাদ পৌঁছায় প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল হোসেনের কাছে। গত ১৬ আগস্ট দুপুরে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কাদায় বন্দি থাকা প্রাণীগুলোর করুণ পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং নেটিজেনদের বিবেককে নাড়া দেয়। সর্বত্র দাবি ওঠে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের। ঘটনাটি মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাজ্জাদ হোসেনের নজরে আসতেই তিনি কালবিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল হোসেনের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে সেদিন সন্ধ্যার আগেই দলবল নিয়ে সরাসরি হাজির হন ঘটনাস্থলে। প্রশাসনের ত্বরিত হস্তক্ষেপে বুকসমান কাদার বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে মহিষ চারটিকে তাৎক্ষণিকভাবে শুকনো ও নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়।
দীর্ঘ ছয় মাস পর মুক্ত বাতাসে শক্ত মাটিতে পা রাখার সুযোগ পেয়ে অবলা প্রাণীগুলোর চোখে যেন পরম স্বস্তির দ্যুতি ফুটে ওঠে। তবে প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে মহিষের মালিক আব্দুল আলিম পালিয়ে যান।
ইউএনও সাজ্জাদ হোসেন মহিষগুলোর জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে জানান, এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত শুকনো জায়গা, উপযুক্ত মেঝে এবং নিয়মিত খাদ্য-পানির সুব্যবস্থা না করা হলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুল হোসেন স্বস্তি প্রকাশ করে জানান, প্রাণীরা মানুষের মতো মুখে কষ্ট বলতে না পারলেও তাদেরও সম্মানের সাথে সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
আইনে পশুর ওপর নিষ্ঠুরতার শাস্তি:প্রাণীর প্রতি এমন নির্দয় আচরণ বাংলাদেশ আইনে স্পষ্টতই দণ্ডনীয় অপরাধ।বাংলাদেশে প্রচলিত ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’ অনুযায়ী কোনো প্রাণীকে দীর্ঘসময় অনুপযুক্ত বা অস্বাস্থ্যকর স্থানে আটকে রাখা, প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি ও আশ্রয় না দিয়ে অবহেলা করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় কষ্ট ও নির্যাতন দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইনের ধারা অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধীকে অনূর্ধ্ব ৬ (ছয়) মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১০ (দশ) হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এছাড়া একই ব্যক্তি পুনরায় এই অপরাধ করলে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ হওয়ার নিয়ম রয়েছে।