আনোয়ার আহমেদ, কুয়ালালামপুর: মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় অভিবাসন বিভাগের এক বিশেষ অভিযানে একটি বড় ধরনের মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘ইকবাল’ নামক এই চক্রটি মূলত বাংলাদেশিদের কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানা গেছে।
আটককৃতদের পরিচয়: অভিযানে মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনই বাংলাদেশি পুরুষ এবং একজন বাংলাদেশি নারী (বয়স ১৮ থেকে ৫৪ বছর)। এছাড়া আস্তানা দেখাশোনা করার অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করা হয়।
মাস্টারমাইন্ড ‘ইকবাল’: অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি ‘ইকবাল’ নামে পরিচিত। তিনি বর্তমানে থাইল্যান্ডে অবস্থান করে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৌশল ও রুট: চক্রটি ২০২৪ সালের শুরু থেকে সক্রিয়। তারা বাংলাদেশ থেকে দালাল চক্রের মাধ্যমে লোক সংগ্রহ করে থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করাত। কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ‘সেফ হাউস’ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
বিপুল অংকের লেনদেন: সিন্ডিকেটটি এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ রিঙ্গিত (মালয়েশিয়ান মুদ্রা) হাতিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভয়াবহ খরচ: প্রতিটি বাংলাদেশি অভিবাসীকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় ঢোকাতে তারা ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ রিঙ্গিত (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকা) পর্যন্ত আদায় করত।
বকেয়া আদায়ের ঘর: আটককৃত বাংলাদেশিরা তিন দিন আগে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন। চূড়ান্ত গন্তব্যে পাঠানোর আগে তাদের এই অস্থায়ী ঘরে আটকে রাখা হতো যতক্ষণ না তারা প্রবেশের চুক্তিকৃত অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধ করছেন। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ওই বাড়ির মালিকের খোঁজ করছে এবং পুরো বিষয়টি ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিরোধী আইন’ (ATIPSOM) এর আওতায় তদন্ত করা হচ্ছে। জাতীয় মানবপাচার নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিটি ব্যক্তিকে যাচাই করা হচ্ছে যে তারা পাচারের শিকার কি না।
ভিকটিম বনাম অপরাধী: তদন্তকারী দল ‘জাতীয় মানবপাচার নির্দেশিকা’ অনুসরণ করছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনেক সময় অবৈধ অভিবাসীদের কেবল ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু এই নির্দেশিকা তাদের মধ্যে কারা পাচারের শিকার (Victims) এবং কারা স্বেচ্ছায় চোরাচালানের অংশীদার, তা আলাদা করতে সাহায্য করবে।
এই অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই বাংলাদেশি। এটি নির্দেশ করে যে:
- মালয়েশিয়ায় আসার জন্য বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে এখনো এক ধরণের বেপরোয়া প্রবণতা রয়েছে।
- বৈধ পথের জটিলতা বা উচ্চ ব্যয়ের কারণে তারা দালালদের খপ্পরে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।
- বাংলাদেশি মাস্টারমাইন্ডের সংশ্লিষ্টতা ইঙ্গিত দেয় যে, প্রবাসীদের একটি অংশ নিজ দেশের মানুষেরই চরম ক্ষতি করছে।










