Home আন্তর্জাতিক বিশ্বজুড়ে ‘স্থূলতা মহামারি’: ৮০ কোটি মানুষের প্রয়োজন ওজন কমানোর ইনজেকশন

বিশ্বজুড়ে ‘স্থূলতা মহামারি’: ৮০ কোটি মানুষের প্রয়োজন ওজন কমানোর ইনজেকশন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা এখন এক চরম সংকটে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বর্তমানে এতটাই স্থূল যে, তারা ‘ওয়েগোভি’ (Wegovy) এবং ‘মৌনজারো’র (Mounjaro) মতো শক্তিশালী ওজন কমানোর ইনজেকশন নেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন।
গবেষণার মূল তথ্য
গবেষকরা ২০০৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৯৯টি দেশের ৮ লক্ষ ১০ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বিবেচনা করে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন এখন এই ইনজেকশন নেওয়ার ক্যাটাগরিতে পড়েন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল: ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় এই হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে দুজনেরও বেশি এই চিকিৎসার যোগ্য। এর পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জেও একই ধরনের উচ্চ হার দেখা গেছে।
কারা এই চিকিৎসার যোগ্য: চিকিৎসাগতভাবে যারা স্থূল (Obese) অথবা যাদের অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, চিকিৎসকরা তাদেরই এই ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
বয়স ও লিঙ্গভেদে পার্থক্য
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই ইনজেকশন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বা যোগ্যতা বেশি। এছাড়া বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্থূলতার ঝুঁকিও বাড়ছে। যেমন:
২০-৩০ বছর বয়সীদের তুলনায় ৫০-৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ মানুষ এই চিকিৎসার যোগ্য হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।
এশিয়ার দেশগুলোতে ওজনের এই মাপকাঠি কিছুটা ভিন্ন রাখা হয়েছে, কারণ এশীয়দের ক্ষেত্রে কম শরীরী ওজনেই স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
ইনজেকশনের কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ
ওজন কমানোর এই ইনজেকশনগুলো মূলত ক্ষুধা কমিয়ে দেয় এবং মানুষকে দীর্ঘক্ষণ তৃপ্ত রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়েট বা ব্যায়ামের তুলনায় এই ওষুধের মাধ্যমে মানুষ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ওজন কমাতে সক্ষম হন।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, এই চিকিৎসা বন্ধ করলেই ওজন দ্রুত ফিরে আসতে পারে।
ওজন ফিরে আসা: ইনজেকশন বন্ধ করার পর প্রতি মাসে গড়ে এক পাউন্ড করে ওজন বাড়ে এবং প্রায় ১৭ থেকে ২০ মাসের মধ্যে রোগী তার আগের ওজনে ফিরে যান।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: ইনজেকশন বন্ধ করার পর রক্তচাপ, সুগার এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাও আগের অবস্থায় ফিরে যেতে দেখা গেছে।
ম্যাস জেনারেল ব্রিঘ্যামের গবেষক ডা. জেনিফার ম্যানে-গোয়েলার বলেন, “কয়েক দশক ধরে আমরা মানুষকে বলে এসেছি যে সমস্যাটি শুধু বেশি খাওয়া এবং কম পরিশ্রমের। কিন্তু এই ওষুধগুলো প্রমাণ করেছে যে, মানুষের স্থূলতার পেছনে আমাদের জীববিজ্ঞানের (Biology) ভূমিকা আমরা যতটা ভাবতাম তার চেয়ে অনেক বেশি।”
বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই ইনজেকশনগুলো সবার জন্য সহজলভ্য করার চেষ্টা করছে। তবে উচ্চমূল্য এবং সরবরাহের ঘাটতি একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদী খাদ্যনীতি পরিবর্তন এবং সামাজিক সচেতনতাই পারে এই স্থূলতা সংকট থেকে মুক্তি দিতে।