বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: পুঁজিবাজারকে আধুনিক, গতিশীল ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ব্যাংক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ কমিয়ে শেয়ার বাজারকে টেকসই বিনিয়োগের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সেটেলমেন্ট সাইকেল ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, প্রযুক্তির আধুনিকায়নের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচার ডে-সেটেলমেন্ট বা নিষ্পত্তি চক্র আরও কমিয়ে আনা হবে। বর্তমানে প্রচলিত টি+২ (ট্রেড ডে প্লাস ২ দিন) সিস্টেম থেকে ধাপে ধাপে টি+১ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে পরবর্তীতে টি+০ বা একই দিনে লেনদেন নিষ্পত্তির (Same-day settlement) প্রস্তুতি নেওয়া হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষক ও অংশীজনরা।
বিনিয়োগকারীদের পুঁজির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সেটেলমেন্ট সাইকেল কমে আসার সবচেয়ে বড় সুফল পাবেন সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। বর্তমানে শেয়ার বিক্রির পর অর্থ তুলতে বা নতুন শেয়ারে খাটাতে দুই কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হয়। আর তা ফান্ডের গতিশীলতা কমিয়ে দেয়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে বিক্রিত অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বা পরের দিনই বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে চলে আসবে। তাতে বিনিয়োগকারির পক্ষে দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নতুন সুযোগ লুফে নেওয়া সম্ভব হবে এবং ফান্ডের স্থবিরতা দূর হবে। আর সেইসঙ্গে, লেনদেন সম্পন্ন হওয়া এবং টাকা বা শেয়ার হাতে পাওয়ার মধ্যবর্তী সময় (Settlement Window) কমে যাওয়ার কারণে কাউন্টারপার্টি বা ডিফল্ট ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। কোনো ব্রোকারেজ হাউজ বা বড় বিনিয়োগকারীর অনিয়মের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আর থাকবে না। কম মূলধন দিয়েও বিনিয়োগকারীরা বছরে বেশি সংখ্যক লেনদেন করতে পারবেন, যা তাদের মূলধন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াবে।
প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান পুঁজিবাজারগুলো (যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট বা ভারতের এনএসই) ইতিমধ্যেই টি+১ বা টি+০ ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন নিশ্চিত হলে প্রবাসী বাংলাদেশি (NRB) এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিটা (NITA) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তহবিল প্রবাহ অনেক বাড়বে। একই সাথে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের সূচকে (যেমন MSCI বা FTSE) দেশের বাজারের রেটিং উন্নত হবে, যা আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
টার্নওভার বৃদ্ধি ও কারসাজি রোধ
অর্থনীতিবিদদের মতে, একই টাকা যখন দুই দিন আটকে না থেকে প্রতিদিন বাজারে ঘুরবে, তখন বাজারের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা বিদ্যমান তারল্য সংকট কাটাতে সাহায্য করবে। এছাড়া সেটেলমেন্ট পিরিয়ড দীর্ঘ হলে সুযোগসন্ধানী চক্র যেভাবে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা বা প্রভাবিত করার সময় পেত, লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তি হলে সেই সুযোগ থাকবে না। বাজারে শেয়ারের সরবরাহ ও চাহিদার প্রকৃত চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হওয়ায় কারসাজি বা অনৈতিক স্পেকুলেশন কমে আসবে।
এই সংস্কার প্রক্রিয়া সফল করতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ব্যাক-অফিস ও আইটি সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে। লেনদেন বৃদ্ধির ফলে ব্রোকারেজ কমিশন বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের এমন সব সর্বশেষ খবরের বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com।