Home আন্তর্জাতিক রেকর্ড চূড়া থেকে স্বর্ণের বড় পতন: বিশ্ববাজারের ধাক্কা বাংলাদেশেও

রেকর্ড চূড়া থেকে স্বর্ণের বড় পতন: বিশ্ববাজারের ধাক্কা বাংলাদেশেও

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: আন্তর্জাতিক বাজারে টানা রেকর্ড গড়ার পর অবশেষে বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত মূল্যবান ধাতু স্বর্ণ। মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের শক্তিশালী ডাটা প্রকাশের পর থেকেই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী। আন্তর্জাতিক এই ধারাবাহিক পতনের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। দেশের বাজারে পর পর চারবার স্বর্ণের দাম কমিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
বিশ্ববাজারের চিত্র: রেকর্ড চূড়া থেকে বড় সংশোধন
চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিক থেকেই আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দামে সংশোধন (Correction) শুরু হয়। গত মে মাসের মাঝামাঝিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণ ৫ হাজার ১৭৭ মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক রেকর্ড স্পর্শ করলেও, জুন মাসের শুরুতেই তা বড় পতনের সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে জুনের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নন-ফার্ম পেরোল’ (Non-farm payrolls) রিপোর্টে ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির তথ্য প্রকাশের পর একদিনেই স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি প্রায় ১৪৬ ডলার বা ৩.২৭ শতাংশ কমে যায়। ওয়াল স্ট্রিটের পূর্বাভাসকে (৮৫ হাজার) ছাড়িয়ে এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক উপাত্ত প্রকাশের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর আশঙ্কা নতুন করে তৈরি হয়েছে। সুদের হার উচ্চ থাকার এই সম্ভাবনায় বিনিয়োগকারীরা অ-লভ্যাংশ উৎপাদনকারী সম্পদ স্বর্ণ থেকে মুখ ফিরিয়ে বন্ড এবং শেয়ার বাজারের দিকে ঝুঁকছেন, যা অর্থনীতিতে ‘রিস্ক-অন’ প্রবণতা হিসেবে পরিচিত। আজ ১২ জুন শুক্রবার, বিশ্ববাজারে স্পট গোল্ডের দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ১৮৯ থেকে ৪ হাজার ২২৩ মার্কিন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে, যা গত এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১০.৬০ শতাংশ কম।
দেশের বাজারে চার দফায় কমল ১৯,৭৭১ টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারের এই ধারাবাহিক দরপতনের প্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম রেকর্ড পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি স্বর্ণ’ বা খাঁটি স্বর্ণের দাম কমার কারণ দেখিয়ে গত কয়েকদিনে টানা চারবার মূল্য হ্রাস করেছে। সর্বশেষ ১১ জুন ঘোষিত সমন্বয় অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৪৩২ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ১৮ হাজার৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ধারাবাহিক এই চার দফার কাটছাঁটে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম মোট ১৯,৭৭১ টাকা কমেছে। এর আগে গত ১০ জুন প্রতি ভরিতে কমানো হয়েছিল ৬ হাজার ৫৯১ টাকা। নতুন মূল্য কাঠামো অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৮ হাজার ৪৩৬ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯২ টাকায় নেমে এসেছে। সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ভরি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৮ টাকা। বাজেট ঘোষণার মুখে ও বিয়ের মৌসুমের আগে স্বর্ণের এই রেকর্ড পতন সাধারণ ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও খুচরা বাজারে অলংকার তৈরির মজুরি ও ভ্যাট যুক্ত হওয়ার কারণে প্রকৃত দাম কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
পতনের নেপথ্যে মূল তিন কারণ
১. যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনীতি ও সুদের হার: মার্কিন শ্রমবাজারের অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি ডলারের সূচককে শক্তিশালী করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ আগামী নভেম্বরের মধ্যে সুদের হার আরও বাড়াতে পারে— এমন পূর্বাভাসের কারণে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ বিক্রি করে ডলার ও সরকারি বন্ডে তহবিল স্থানান্তর করছেন।
২. চীন ও অন্যান্য সেন্ট্রাল ব্যাংকের ক্রয়ে ধীরগতি: ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (PBoC) মে মাসে ১০ টন স্বর্ণ রিজার্ভে যোগ করলেও, সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক গোল্ড ইটিএফ (ETF) থেকে বড় অঙ্কের তহবিল উত্তোলন করা হয়েছে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের অস্থির বাজার ছেড়ে শেয়ার বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
৩. ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সাময়িক প্রশমন: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও লোহিত সাগরের সংকটের কারণে স্বর্ণের যে ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়কালীন চাহিদা তৈরি হয়েছিল, তা মার্কিন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় স্বর্ণের বাজারে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম কমে এসেছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
জেপি মরগ্যান এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ২০২৬ সালের স্বর্ণের গড় দামের পূর্বাভাস কিছুটা কমিয়ে ৫ হাজার ২৪৩ ডলারে নামালেও, বছর শেষের লক্ষ্যমাত্রা এখনো ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৬ হাজার ডলারের ঘরে বজায় রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িক এই পতন মূলত একটি বড় ধরনের মার্কেট কারেকশন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী স্বর্ণ কেনার প্রবণতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোগত ঝুঁকির কারণে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে স্বর্ণ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
ব্যবসায়িক খবরাখবর এবং বাজার পরিস্থিতির নিয়মিত আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com। কনটেন্টটি নিয়ে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান এবং আমাদের পেজটি ফলো করুন।