বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন করে অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আবারও এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও বিশ্ববাজারের আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে এই সংঘাতের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেল, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ ও অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ মূলত পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে:
বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ আমদানির মাধ্যমে মেটায়। বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এই পথ যুদ্ধকবলিত বা বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দাম একলাফে অনেকটা বেড়ে যেতে পারে।
এর ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জ্বালানির দাম বাড়লে তার ‘চেইন ইফেক্ট’ সরাসরি পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। চাষাবাদে ডিজেলের বাড়তি খরচ এবং পণ্য পরিবহনে উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। এটি দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করবে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রায় এক কোটির বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত। যদিও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা নেই, তবে সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে ওই দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।
এতে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রপ্তানি বাণিজ্য ও শিপিং খরচ: লোহিত সাগর বা সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়লে জাহাজের ভাড়া বা বিমা খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এটি বড় হুমকি।
পরিবহন খরচ বাড়লে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে এবং নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার হার কমে যেতে পারে।
ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কমলে রিজার্ভের ওপর নতুন করে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। এটি ডলারের বিপরীতে টাকার মানকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প উৎস খোঁজা, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি করা, রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় পরীক্ষা। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সময়োপযোগী ও আগাম অর্থনৈতিক সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি।
নিয়মিত আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাদের জানান।