অসীম শক্তির রোমাঞ্চকর বিজ্ঞান
তাসনিম বাবু
সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে কয়লা ও খনিজ তেলের ব্যবহার শিখেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে এমন এক ধাতুর সন্ধান মিলেছে, যার সামান্য একটি অংশ দিয়ে একটি গোটা শহর বছরের পর বছর আলোকিত রাখা সম্ভব। রুপালি-ধূসর রঙের সেই ভারী ধাতুটি হলো ইউরেনিয়াম। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তির আধার, কিন্তু এই শক্তিই আবার পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির কারণ।
কল্পনা করুন, এক ট্রাক কয়লা পুড়িয়ে আপনি যে পরিমাণ তাপ বা বিদ্যুৎ পাবেন, মাত্র এক কেজি ইউরেনিয়াম থেকে তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তি পাওয়া সম্ভব। পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র এক কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ থেকে প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ টন উচ্চমানের কয়লার সমান।
এই অবিশ্বাস্য শক্তির রহস্য লুকিয়ে আছে এর পরমাণুর ভেতরে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যখন একটি ইউরেনিয়াম পরমাণুকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করা হয়, তখন সেটি ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’। এই বিভাজনের সময় সামান্য পরিমাণ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র অনুযায়ী বিপুল তাপে পরিণত হয়।
এই তাপ দিয়েই পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং সেই বাষ্পে ঘোরে বিশালাকার টারবাইন, যা থেকে উৎপন্ন হয় হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
পারমাণবিক চুল্লি: যেখানে নিয়ন্ত্রিত হয় ‘দানব’
ইউরেনিয়াম থেকে যে শক্তি বের হয়, তা অনেকটা বন্য ঘোড়ার মতো। একে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা হবে চেরনোবিলের মতো মহাবিপর্যয়। আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে গ্রাফাইট বা ক্যাডমিয়ামের রড ব্যবহার করে এই শক্তিকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যেখানে প্রতিনিয়ত কার্বন নিঃসরণ হয়ে বায়ুমণ্ডল বিষাক্ত হচ্ছে, সেখানে ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কোনো ধোঁয়া বা গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়াই। একারণেই একে বলা হয় ‘সবুজ জ্বালানি’ বা গ্রিন এনার্জি।
বিপদ যখন দোরগোড়ায়: তেজস্ক্রিয়তার ভয়
শক্তির দিক দিয়ে এটি যতটা শক্তিশালী, বিপদের দিক দিয়ে ততটাই প্রাণঘাতী। ইউরেনিয়াম প্রাকৃতিকভাবেই তেজস্ক্রিয়। এটি ক্রমাগত অদৃশ্য আলফা কণা নির্গত করতে থাকে। যদি কোনো কারণে এই তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষের ডিএনএ নষ্ট করে দিতে পারে। এমনকি এর বর্জ্য বা ‘নিউক্লিয়ার ওয়েস্ট’ হাজার বছর ধরে বিষাক্ত ও তেজস্ক্রিয় থাকে, যা মাটির নিচে পুঁতে রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।
ভূ-রাজনীতির তুরুপের তাস
বর্তমানে ইউরেনিয়াম কেবল একটি খনিজ নয়, এটি দেশগুলোর ক্ষমতার মাপকাঠি। যে দেশের হাতে ইউরেনিয়াম এবং এটি প্রক্রিয়াকরণের প্রযুক্তি আছে, তারাই জ্বালানি রাজনীতিতে সবচেয়ে এগিয়ে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ইউরেনিয়ামের দাম এবং এর সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তা প্রমাণ করে এটিই হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতের ‘নতুন পেট্রোলিয়াম’।
ইউরেনিয়াম মূলত মানুষের হাতে থাকা এক অমর শক্তির উৎস। এটি দিয়ে আমরা অন্ধকার পৃথিবী দূর করতে পারি, আবার এক নিমেষে ছাই করে দিতে পারি তিলে তিলে গড়া সভ্যতা। বিজ্ঞানের এই দ্বিমুখী রূপই ইউরেনিয়ামকে করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় ধাতু।
আগামী পর্বে : পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি ও ইউরেনিয়াম: রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে কেন কাঁপছে বিশ্ব?
এই বিষয়ে আরও আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন










