Home অন্যান্য ইতিহাসের সাক্ষী: একজন রিপোর্টারের ডায়েরি থেকে

ইতিহাসের সাক্ষী: একজন রিপোর্টারের ডায়েরি থেকে

কামরুল ইসলাম
পেছনের দিকে তাকালে অবাক লাগে, দেখতে দেখতে পেশাগত জীবনের এতগুলো বছর কীভাবে চলে গেল! আজও চোখ বুজলে মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যখন ‘দৈনিক আজাদ’-এ লেখালেখি শুরু করলাম, তখন কে জানত ভাগ্যের এক অদ্ভুত পরিহাস অপেক্ষা করছে।
১৯৭৫ সালের ১৬ জুন ‘সংবাদপত্র (ডিক্লারেশন বাতিল) অধ্যাদেশ’-এর মাধ্যমে মাত্র চারটি পত্রিকা রেখে সব বন্ধ করে দেওয়া হলো। আমার নিয়োগ পাওয়ার স্বপ্নটাও যেন ‘আজাদ’-এর সাথেই সাময়িকভাবে থমকে গেল।
কিন্তু সাংবাদিকের কলম কি আর দমে থাকে? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংবাদপত্রগুলোর ওপর থেকে কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল হতে শুরু করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ‘সংবাদ’সহ আরও কিছু পত্রিকা পুনরায় প্রকাশের অনুমতি পেতে থাকে। সর্বপ্রথম অনুমতি পায় ‘সংবাদ’, তারিখটি ছিল ৯ অক্টোবর, ১৯৭৫। এবার সেখানে চেষ্টা শুরু করলাম এবং আমার বেশকিছু খবর প্রকাশিত হতে লাগল।
১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে দেখা করলাম প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্য সমালোচক বার্তা সম্পাদক সন্তোষ গুপ্তের সাথে। তিনি বেশ আগ্রহ ভরে আমাকে ‘সংবাদ’-এ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ দেন। এরও অনেক পরে, ১৯৮১ সালের ১৭ ডিসেম্বর আমি একই পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করি।
ইডেন কলেজের সেই ‘কঠোর’ প্রহরী ও এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব
স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেওয়ার দু-একদিনের মাথায় আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল আজিমপুরের ইডেন মহিলা কলেজের এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। হাতে কলেজের প্যাডে লেখা চিঠি নিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম গেটে। কিন্তু সেখানে নিয়োজিত দুই ছাত্রী-প্রহরী আমার পথ আগলে দাঁড়াল। আমার কোনো আইডি কার্ড নেই, তাই তারা বিশ্বাসই করল না যে আমি সাংবাদিক। এমনকি কলেজের পাঠানো চিঠি দেখালেও তাদের সাফ জবাব, “এটা তো বার্তা সম্পাদককে লেখা, আপনি তো বার্তা সম্পাদক নন।”
প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই ব্যর্থ হওয়ার ভয় আর বিপত্তিতে যখন দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কী করা যায়, তখনই দেখলাম একদল অতিথি একসাথে প্রবেশ করছেন। সেই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কৌশলে ভেতরে ঢুকে পড়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার সময় সেই দুই ছাত্রীকে তখনও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে দেখে অবাক হয়েছিলাম।
কিন্তু নিয়তির লিখন কে জানত! সেই ঘটনার বহু বছর পর জীবনের অন্য এক বাঁকে আমাদের আবার দেখা হয়ে গেল। সেই দুই প্রহরীর একজনের সাথে আলাপ হতে হতে যখন পুরনো স্মৃতির পাতা উল্টাতে বসলাম, তখন দুজনেই থমকে গেলাম। সেদিনের সেই বিড়ম্বনার গল্প শুনে আমরা হো হো করে হাসলাম। সেদিনের সেই কঠোর ‘প্রহরী’ মেয়েটি আজ আমার অন্যতম প্রিয় বন্ধু। আজও আমাদের যোগাযোগ অটুট। পেশাগত জীবনের সেই প্রথম বিড়ম্বনা আজ এক মধুর বন্ধুত্বের স্মারক হয়ে আছে।
ক্ষমতার দোরগোড়ায়: তিন দিনের ব্যবধানে দুই এরশাদ
আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা সম্ভবত ১৯৮২ সালের মার্চের সেই দিনগুলো। ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিল্পী শামীম সিকদারের ভাস্কর্য প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে এলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ। আমি সেখানে রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। জেনারেল এরশাদ সেদিন শিল্পীদের সাথে বেশ সখ্যতা দেখাচ্ছিলেন এবং বলেছিলেন— “আমরা সৈনিক, আমরাও এদেশের সন্তান, এদেশের উন্নয়নে আমরাও অংশগ্রহণ করতে চাই।”
কে জানত, এই ‘অংশগ্রহণ’-এর প্রকৃত অর্থ কী! এর ঠিক তিন দিন পর, ২৪ মার্চ তিনি ক্ষমতা দখল করলেন। আর ক্ষমতা গ্রহণের পরদিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ তার প্রথম পাবলিক অনুষ্ঠানটিও কাভার করার সুযোগ আমার হয়েছিল। ধলপুর কলোনিতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সেই সমাবেশে তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের বন্ধু হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। ক্ষমতা দখলের আগের শেষ এবং ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী প্রথম—এরশাদের এই দুটি পাবলিক অনুষ্ঠানই সরাসরি কাভার করা আমার পেশাগত জীবনের এক বিরল ঐতিহাসিক দলিল।
সংঘাত ও প্রাপ্তির খেরোখাতা
কর্মজীবনের পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। ‘সংবাদ’ ছেড়ে পরবর্তীতে ‘দৈনিক খবর’-এ সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর সংবাদিকতার আড়ালের এক নোংরা রূপও দেখেছি। মালিকের চাটুকার আর গুপ্তচরদের কারণে অকারণে হেনস্তা হতে হয়েছে। চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচন কাভার করে ফেরার পর সামান্য দেরি হওয়ার অজুহাতে আমাকে অন্যায়ভাবে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি। এরপর রেডিও বাংলাদেশ, বার্তা সংস্থা বিএনএ এবং চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক দৈনিকে কাজ করেছি।
আজ যখন অবসরে কলম নিয়ে বসি, তখন মনে হয় ১৯৮১ সাল থেকে আজ অব্দি ইতিহাসের বহু বাঁকবদল খুব কাছ থেকে দেখেছি। একজন রিপোর্টার হিসেবে আমি কেবল সংবাদ লিখিনি, সময়ের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু পার করেছি। এই তৃপ্তিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।