নয়ন দাস, বগুড়া:উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া জেলা তার প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অসংখ্য অলৌকিক লোককাহিনীর জন্য সুপরিচিত। মহাস্থানগড় থেকে শুরু করে জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা রহস্যময় স্থান। এমনই এক গা ছমছমে ও অলৌকিক বিশ্বাসে ঘেরা স্থান হলো স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত ‘জীবন্ত সতী নারীর কবর’। বগুড়ার কাহালু ও দুপচাঁচিয়া সীমানা সংলগ্ন (মূলত কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দেওগ্রাম ফকিরপাড়া এলাকায়) অবস্থিত এই কবরটি ঘিরে যুগের পর যুগ ধরে এক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে, যা দূর-দূরান্তের মানুষকে আজও কৌতূহলী করে তোলে।
প্রচলিত সেই অলৌকিক কাহিনী
স্থানীয় প্রবীণ ও মুরুব্বিদের মুখে এই কবরটিকে ঘিরে যে গল্পটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তা হলো— শত বছর আগে এই অঞ্চলে ‘বিবি সাহেবান’ নামে এক পরম ধার্মিক ও সতী নারী বাস করতেন। লোককথা অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ের এক প্রভাবশালী ও অত্যাচারী জমিদার বা কুচক্রী মহল তার সতীত্ব ও সম্মানহানির চেষ্টা চালায়।
নিরুপায় ও নিরপরাধ সেই নারী নিজের সম্মান ও সতীত্ব রক্ষার্থে কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে আকুল প্রার্থনা জানান। লোকবিশ্বাস বলে, তার প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে অলৌকিকভাবে সেখানকার মাটি দুভাগ হয়ে যায় এবং তিনি জীবন্ত অবস্থায় মাটির ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর মাটি আবার আগের মতো সমান হয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই স্থানটি ‘বিবি সাহেবানীর জীবন্ত সমাধি’ বা ‘সতী নারীর কবর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
যত রহস্য ও বিশ্বাস
শত বছরের পুরনো এই স্থানটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে নানা গভীর বিশ্বাস ও কিছু গা ছমছমে রহস্য:
অলৌকিক গাছ ও সাপের উপাখ্যান: কথিত আছে, এই কবরের পাশে একটি প্রাচীন তেঁতুল গাছ রয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই গাছের কোনো ডালপালা কেউ কাটতে বা ভাঙতে পারে না এবং কাটলে অলৌকিক ক্ষতি হয়। এমনকি লোকমুখে এমনও প্রচলিত যে, কবরটি অদৃশ্য কোনো বিষধর সাপ দ্বারা পাহারায় থাকে, যদিও এর কোনো বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
মানত ও ভক্তদের ভিড়: বহু মানুষ এই স্থানটিকে পবিত্র বা অলৌকিক মনে করে রোগবালাই থেকে মুক্তি কিংবা মনের আশা পূরণের উদ্দেশ্যে এখানে মানত করতে আসেন। বিশেষ করে নারীদের আগমন এখানে চোখে পড়ার মতো।
বাস্তবতার নিরিখে স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য
বিজ্ঞান ও আধুনিকতার যুগে এই ধরনের অলৌকিক কাহিনীকে অনেকেই কেবলই ‘লোককথা’ বা ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ধর্মীয় গবেষকদের মতে, এটি ইসলামের মূল ধারার কোনো বিষয় নয়। অনেক সময় স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল মাজার বা এ জাতীয় স্থান তৈরি করে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য কাল্পনিক গল্প তৈরি করে থাকে। মূলত এটি শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা একটি রোমাঞ্চকর লোককাহিনী, যা মানুষের মুখে মুখে ছড়াতে ছড়াতে আজ এই রূপ ধারণ করেছে।
বাস্তবতা যা-ই হোক না কেন, লোকসংস্কৃতি এবং প্রাচীন কাহিনীর অংশ হিসেবে বগুড়ার এই নিভৃত গ্রামের ‘জীবন্ত সতী নারীর কবর’ বা ‘বিবি সাহেবানীর সমাধি’ আজও এক পরম কৌতূহলের নাম।
নিয়মিত এমন রোমাঞ্চকর ও তথ্যসমৃদ্ধ ফিচার প্রতিবেদন পড়তে এবং আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং নিচের মন্তব্য বক্সে আপনার মতামত শেয়ার করুন।