চট্টগ্রামের নতুন মাস্টারপ্ল্যান ও ভবিষ্যতের যাতায়াত
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগাম: চট্টগ্রাম শুধু দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীই নয়, এটি পুরো অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাব ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যদ্বার। কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি নগরীর পরিবহন ব্যবস্থা। ফলে যানজট, অপরিকল্পিত গণপরিবহন এবং সড়ক বিশৃঙ্খলা প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং বন্দরনগরীর আগামী ২৫ বছরের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তৈরিতে ‘চট্টগ্রাম ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’-এর একটি খসড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর অধীনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা এই খসড়া প্রস্তাবনায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার সম্ভাব্য জনসংখ্যা, অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং বন্দরের প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনায় রেখে যাতায়াত ব্যবস্থার একাধিক কৌশলগত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম: জনসংখ্যা ও সম্ভাব্য যাতায়াত চাহিদা
খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শুমারি অনুসারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৫ লাখ। প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালে এই জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখে পৌঁছাতে পারে। একই সাথে সিটি করপোরেশন ও সংলগ্ন এলাকায় কর্মসংস্থানও বহুগুণ বৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বর্তমানে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক প্রায় ৭৪ লাখ ট্রিপ বা যাত্রা সম্পন্ন হলেও, ২০৫০ সালে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখে দাঁড়াতে পারে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্ভাব্য চাপ সামলাতে বিদ্যমান সনাতন পরিবহন কাঠামোর বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় যেসব গুরুত্ব ও কৌশলের প্রস্তাব
প্রতিবেদনে কেবল নতুন নতুন মেগা প্রজেক্ট বা ফ্লাইওভার নির্মাণের বদলে বিদ্যমান অবকাঠামোর সঠিক ব্যবহার, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে:
১. সমন্বিত গণপরিবহন ও বাস রুট র্যাশনালাইজেশন: ব্যক্তিমালিকানাধীন অনিয়ন্ত্রিত বাসের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে পুরো ব্যবস্থা একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ই-টিকিটিং ও ডিজিটাল ভাড়া আদায় ব্যবস্থার প্রস্তাব রয়েছে।
২. স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ও ইন্টারসেকশন ব্যবস্থাপনা: ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হাত উঁচিয়ে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বদলে শহরের প্রধান মোড়গুলোতে পর্যায়ক্রমে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল লাইট ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম বসানোর পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। সিগন্যালের ৫০ মিটারের মধ্যে যেকোনো পার্কিং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
৩. পথচারীদের অগ্রাধিকার: তথ্য অনুযায়ী শহরের ৬০% মানুষ হেঁটে যাতায়াত করলেও ফুটপাতের অভাব ও দখল বড় সমস্যা। খসড়ায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার নতুন ও উন্নত ফুটপাত নির্মাণ এবং নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং চালুর জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
৪. ভারী ও বন্দর ট্রাফিকের জন্য আলাদা সড়ক: বে টার্মিনাল ও অন্যান্য বন্দর সচল হলে পণ্যবাহী গাড়ির চাপ শহরের অভ্যন্তরীণ সড়ক থেকে আলাদা রাখতে ‘ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর’ এবং ১০ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার টার্মিনালের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৫. রেল ও নৌপথের ব্যবহার: শহরের অভ্যন্তরীণ ও উপশহরগুলোর মধ্যে কম্যুটার ট্রেন এবং কর্ণফুলী নদী কেন্দ্রিক ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করে বহুমাত্রিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাথমিক রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে এই খসড়া প্রস্তাবনাটি বিভিন্ন অংশীজন, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি চট্টগ্রামের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তবে তার জন্য প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন কৌশল ও কঠোর প্রশাসনিক সদিচ্ছা।
চট্টগ্রামের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা বা খসড়া প্রস্তুতের ইতিহাস নতুন নয়। এর আগেও নানা সময়ে একাধিক সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হলেও যথাযথ সমন্বয় ও বাস্তবায়ন কৌশলের অভাবে তার বড় অংশই ফাইলের ড্রয়ারে বন্দী থেকে গেছে। বিভিন্ন সেবা সংস্থা—যেমন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে দৃশ্যমান আন্ত সংস্থা সমন্বয়ের অভাবই বরাবর মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি না করে কেবল খসড়া প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে শহরের পরিবহন কাঠামো বদলে ফেলা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
পাশাপাশি, বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বা ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে অতীতেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কিংবা ফুটপাত দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে কারিগরি পরিকল্পনার চেয়ে প্রশাসনিক কঠোরতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা বেশি প্রয়োজন। তাই এই খসড়া প্ল্যানটি কেবল একটি উচ্চাভিলাষী দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব রূপ পাবে, তা নির্ভর করছে প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও সংস্থাগুলোর কঠোর বাস্তবায়ন ক্ষমতার ওপর।